মেহেরপুরের চিহ্নিত বধ্যভূমিগুলো আজ অবধি সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ না নেয়াতে হারিয়ে যেতে বসেছে। কোন বধ্যভূমিতেই নামফলকটুকুও টাঙানো হয়নি। চিহ্নিত বধ্যভূমিগুলো ইটের পর ইট গেঁথে বড় বড় ইমারত গড়ে তোলা হয়েছে। কোনখানে পুকুর করে সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে। সরকারি জমির উপর বধ্যভূমিগুলোতেও কোন স্মৃতিচিহ্ন নেই। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বধ্যভূমিগুলো থেকে হাড়গোড় উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন চত্বরে গণকবর দেয়া হয়। সেই গণকবরটিও নামফলকহীন এবং অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেহেরপুর সরকারি কলেজ মাঠ বধ্যভূমি: স্থানীয় সরকারি কলেজের পেছনের ইমান আলীর জমি ও সেই সময়ের ইটখোলা ছিল এখানকার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। এখানে পাকবাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করত। সবচেয়ে বড় এ বধ্যভূমি থেকে শতাধিক মানুষের হাড়-গোড় মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত এ বধ্যভূমিতে নামফলকটুকুও টাঙানো হয়নি। সেখানে এক অংশে মাছচাষ হচ্ছে। বাকিঅংশ জমি হাতবদল হয়ে বড় বড় ইমারত গড়ে উঠেছে সেখানে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয় বধ্যভূমি: মেহেরপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বর ছিল পাক বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি। এ বধ্যভূমি থেকে অনেক নারী পুরুষের হাড়-গোড় ও মাথার খুলি উদ্ধার হয়। এখানেও নেই কোন নামফলক। এ পর্যন্ত কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি সংরক্ষণের।
ওয়াপদা মোড় বধ্যভূমি: স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ওয়াপদার পশ্চিমে বটতলা থেকে অজস্র নারী পুরুষ ও শিশুর লাশ ও হাড় গোড় উদ্ধার করা হয়। এখানে এখন বিভিন্ন জন ইটের পর ইট গেঁথে হারিয়ে দিয়েছে সেই বধ্যভূমির চিহ্ন। সেখানে এখন বসতি গড়ে উঠেছে।
বাস স্টেশন বধ্যভূমি: মেহেরপুরের বাসস্টেশন এলাকায় তৎকালীন মহকুমা পশুপালন অফিস চত্বর ছিল আরেকটি বধ্যভূমি। কিন্তু এ স্থানটির কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সেখানে এখন জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস। চারিদিকে অফিসের পাকা বাউন্ডারি দেয়া হলেও বধ্যভূমির কোন নামফলক দেয়া হয়নি।
মেহেরপুর ভোকেশনাল বধ্যভূমি: স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন মেহেরপুর ভোকেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট কলেজটি পাকবাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে কিছু লাশ এখানে কবর দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর এখান থেকে শতাধিক মানুষের মাথা ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এ জায়গাটি সংরক্ষণ করা হয়নি।
তেরঘরিয়া বধ্যভূমি: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে যাবার সময়ে তেরঘরিয়া বিলপাড়ে জড়ো করে পাক বাহিনী ক’জন বাঙ্গালীকে প্রকাশ্যে গুলি করে। পরে গর্ত খুঁড়ে লাশ মাটি চাপা দিয়ে রাখে। মুক্তিযুদ্ধের পরে সেখানে অসংখ্য মানুষের হাড়-গোড় ও মাথার খুলি পাওয়া যায়। স্থানটি সংরক্ষিত নেই বলে এখন খুঁজে পাওয়া যায় না।
মেহেরপুর কালাচাঁদপুর বধ্যভূমি: পাকবাহিনী কালাচাঁদপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে চোখ বেঁধে একটি ঘরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। পরে কালাচাঁদপুর সড়ক সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ পুঁতে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর সেখান থেকে অসংখ্য মানুষের হাড়গোড়, মাথার খুলি উদ্ধার হয়। কিন্তু সংরক্ষিত না থাকায় এখন সেখানে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি।
জোড়পুকুরিয়া বধ্যভূমি: স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘ডেটলাইন ১৯৭১’ নামে একটি নামফলক ছিল। সেটি একসময় নষ্ট হয়ে গেছে। ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়া বিভিন্ন বয়সের মানুষকে ওই সড়কে গুলি করে হত্যা শেষে রাস্তার পাশেই তাদের পুতে রাখা হতো। পরবর্তীতে আর কোন নামফলক না থাকায় সেই বধ্যভূমির চিহ্ন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ভাটপাড়া বধ্যভূমি: ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর ভাটপাড়া কুঠিবাড়িতে পাকসেনা ক্যাম্পের সদস্যরা মজিবর রহমান, আফসার মালিথা, জবতুলাহসহ ৮জন নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে এনে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। লাশগুলো কবর দিতে সাহস করেনি কেউ। হত্যকান্ডের সাত দিন পর লাশের গন্ধে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠলে পাকসেনাদের অনুমতিক্রমে সাহারবাটি গ্রামের মৃত আব্দুর রসিদ, গোলাম হোসেন ও ইদ্রিস আলীর জমিতে পাশাপাশি দুটি কবর খুড়ে ৮টি লাশ কবর দেন। স্বাধীনতার পর নিহতদের স্বজনরা ইটের প্রাচীর দেয়। জমির মালিক পরবর্তীতে প্রাচীর ভেঙ্গে কবরের জায়গা টুকু খালি রেখে চাষাবাদ করা হচ্ছে।
ইত্তেফাক/জামান
