চট্টলবীর এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিদায় নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক, গণমানুষের নেতা চট্টল দরদী মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের নক্ষত্রের বিদায় হলো। সকাল থেকে রাত অবদি যিনি মানুষের কল্যাণ ও দাবি আদায়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তার জীবনাবাসনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মানুষের দাবি আদায়ের সেই কণ্ঠ স্তিমিত হয়ে গেল সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তিনি সরকারি দলে থাকেন কিংবা বিরোধী দলে থাকেন না কেন, তার ভাবনায় আসা জনগণ ও দেশের স্বার্থে নেমে পড়তেন মাঠে ময়দানে। তাইতো আওয়ামী লীগের প্রথম সরকারের সময় তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের মোহনায় স্টিভিডোরিং সার্ভিস অব আমেরিকা (এসএমএ) কর্তৃক বন্দর নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। বন্দরের ২২টি শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলায় শেষ পর্যন্ত তাদের পিছু হটতে হয়েছে।
সে সময়কার বন্দর শ্রমিক লীগ নেতা আবু জাফর আজাদ বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী না থাকলে এসএসএকে হঠানো যেত না। এমনকি বর্তমান সময়েও তিনি এক মাস পূর্বে অসুস্থতার আগেরদিন পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ঘোষিত হোল্ডিং ট্যাক্সের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার দলের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে জনগণের কল্যাণে তীর্যক ভাষায় বক্তব্য প্রদান এবং সভা সমাবেশ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। চট্টগ্রামের প্রতি তার অপরীসীম দরদ, ভালোবাসা, মায়া তাকে সারা জনম আবর্তিত করতো। শেষ পর্যন্ত নগরবাসী সেই হোল্ডিং ট্যাক্স থেকে রক্ষা পেল। আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি ক্রমাগতভাবে এগিয়ে যান বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজয় তার হাতের মুঠোয় চলে আসে বলে সংশ্লিষ্টরদের অভিমত।
আর বিরোধী দলে থাকাকালীন তার আন্দোলনের ইতিহাসের ইয়ত্যা নেই। তিনি চট্টগ্রাম শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশি একটি এয়ার লাইন্সকে ছেড়ে দেয়ার বিরোধীতা করেছেন সামাজিক অনাচার ও মূল্যবোধের কথা চিন্তা করে। জনগণের স্বার্থে সড়ক সম্প্রসারণসহ অনেক কাজের ক্ষেত্রে আইনি মারপ্যাঁচের নিকট নত হননি। আবার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজ চিন্তা ও কর্পোরেশনকে আর্থিক স্বাবলম্বী করতে সরকারি সিদ্ধান্ত না নিয়েও প্রকল্প গ্রহণে পিছপা হননি। এ নিয়ে বিগত ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় তাকে জেলে যাওয়া থেকে শুরু করে অনেক মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনগণের কল্যাণের টানে তিনি ন্যায় অন্যায়, সঠিক-বেঠিক কিংবা আইনী-বেআইনি কোন প্রকার হিতা-হিত জ্ঞান শূন হয়ে লক্ষ্য অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তাইতো তার ব্যাপারে এক লেখক লিখেছেন তিনি গাছে চড়তেন লাফিয়ে, পুকুরে পড়তেন ঝাঁপিয়ে এবং দুঃখিদের দিতেন বিলিয়ে।
অত্যন্ত সম্মোহনী শক্তির অধিকারি মহিউদ্দিন চৌধুরী সহজে যে কাউকে আপন করে নিতে পারতেন। তার আতিথেয়তা থেকে কেউ বঞ্চিত হতে পারতো না। চশমা হিলের তার বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে না খেয়ে ফিরতে পারতেন না। শারীরিক অনেক সমস্যা থাকার পরও এক মাস পূর্বেও তিনি মানসিক দিক থেকে ছিলেন শক্ত এবং অবিচল।
রাউজানের গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণকারি মহিউদ্দিন চৌধুরী রেল বিভাগে পিতার চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে নোয়াখালীতেও শিশুকাল অতিবাহিত করতে হয়েছে। খুবই ডান-পিটে মহিউদ্দিন চৌধুরী বাবা-মায়ের নিকট কালু নামে পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকে প্রতিবাদি ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। সামাজিক ত্যাগ তিতিক্ষা, মানুষের অসহায়ত্ব ও কষ্ট তাকে নাড়া দিত। তাইতো ৬৭ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন নেয়ার পরও তিনি নিজের জীবনকে জড়িয়ে ফেলেছেন মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রামে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হয়েছিলেন। রাজনৈতিক নেতা ও অসাধারণ কর্মঠ মহিউদ্দিন চৌধুরী শীতের কাপুনী কিংবা তীব্র তাপদাহেও সেই ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন আন্দোলন সংগ্রামে। একাধিকবার কারাবরনসহ হুলিয়া নিয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করেছেন। তিনি পত্রিকার হকার, চা-দোকানদার, রেডিও মেকানিকের কাজ করেছেন জীবনের চলার পথের কঠিন বাস্তবতায়। চশমা হিলের বাসা থেকে নগরীর নিউ মার্কেট সংলগ্ন ঐতিহাসিক আলোচিত গ্র্যান্ড হোটেল ও দারুল ফজল মার্কেটের আওয়ামী লীগের কার্যালয় ঘিরে ছিল তার প্রধান বিচরণ কেন্দ্র।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৯৪৪ সালের ১লা ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করে। এ দেশের মুক্তি সংগ্রামের অনেক চড়াই-উৎরাই এবং আন্দোলনের কালজয়ী সামী হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নগরীতে নৌ কমান্ডের অধীনে আটক হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন। একই সাথে ৭১ এর ২ মার্চ তারই নেতৃত্বে পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো হয়েছিল লালদীঘিতে। এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি হয়ে আগরতলা ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবার হত্যার পর তাকে চলে যেতে হয়েছে কোলকাতায়। সেখানে অনেক কষ্টে জীবন পার করতে হয়েছে তাকে। এমনকি কোলকাতা সিটি কর্পোরেশনও একটি ছোট্ট চাকরি করেছেন বলে তার এক সাথী অমলেন্দু বাবু তার বক্তব্যে বলেছেন। সেই মহিউদ্দিন চৌধুরী আবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হয়েছেন ১৯৯৪ সালে। পরপর তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে হ্যাট্রিক করেছেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেয়রের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও আদর্শ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যুগান্তকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় যেমন গড়েছেন তেমন অনেক অনগ্রসর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে এনে আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি একক সিদ্ধান্তে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, যার জন্য আলোচনা ও সমালোচনায় পড়েছিলেন। সরকারি দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে অনেক নিয়ম-নীতিকে পাশ কেটে চলেছেন। সাংবাদিকদের নিকট মহিউদ্দিন চৌধুরী অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। তাইতো কোন কর্মসূচির পূর্বে তিনি সাংবাদিকদের চশমা হিলে ডেকে আপ্যায়নের (মেজবান) মাধ্যমে তার অবস্থান তুলে ধরতেন। এরপরও তার অনেক সিদ্ধান্ত ও কাজের ব্যাপারে সাংবাদিক ও সমাজের বিভিন্ন অংশের ভিন্নমত গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। তাইতো জীবনের জয়ের ন্যায় অনেক পরাজয়কেও আলিঙ্গন করতে হয়েছে। তিনি বাধা ধরা নিয়মের মধ্যে না চলে মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াতেন। তাইতো দলের অনেকের বিরাগভাজন হতেন তিনি। বহু খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী সংগঠন তার হাতে গড়ে উঠেছিল। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্যও তিনি আন্দোলন করেছেন। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন।
তিনি মেয়র হজ্ব কাফেলার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজীদের নিয়ে যেতেন। আরাফাতের ময়দানে তীব্র তাপদাহে অস্থির হাজীদের শরবত বানিয়ে পান করাতেন। গত হজ্বেও তিনি গিয়েছিলেন। তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরও বিদেশে তীর্থযাত্রার ব্যবস্থা করেছিলেন। ভারত ও থাইল্যান্ডে তার পরিচিত অনেক চিকিৎসক ছিল। তার সুপারিশ নিয়ে অনেক রোগী যেতেন। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে ভিসা পেতেও তার শরনাপন্ন হতেন রোগীরা। বেওয়ারিশ লাশের দাফন-কাপন করতে তিনি ছুটে যেতেন লোকজনের বাসা-বাড়িতে। শিশিরের মত ভেজা তার রাগ-অভিমানের মহিউদ্দিন চৌধুরী তার দাবি ও লক্ষ্য অর্জনে ছিলেন কঠোর। চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে দলমত নির্বিশেষে মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের দরদী ও আপোষহীন নেতা।
ইত্তেফাক/এমআই
