মির্জাপুরে আজও চিহ্নিত হয়নি বধ্যভূমি

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:১৪
 
স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে চিহ্নিত হয়নি বধ্যভূমি ও শহীদরে গণকবর। এমনকি নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতিফলক। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর সঙ্গে দেশের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছিল মির্জাপুরে। ১৯৭১ সালের ৭ মে গণহত্যা, ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত এবং ৩ এপ্রিল দেশের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান-সাটিয়াচড়া নামক স্থানে। দীর্ঘ ৮ মাস ১০ দিন যুদ্ধের পর দামাল ছেলেরা পাক-হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মির্জাপুরকে মুক্ত করে।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে সাড়া দিয়ে টাঙ্গাইলে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। এর নেতৃত্বে ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের চেয়ারম্যান ও সাবেক সাংসদ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, প্রয়াত আজাদ কামাল বীরবিক্রম, সাবেক সাংসদ এবং বর্তমান টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জননেতা ফজলুর রহমান খান ফারুক এবং সংসদ সদস্য ও সড়ক পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. একাব্বর হোসেন।
 
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস জানান, মির্জাপুর উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৮৯২ জন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে এখানে যুদ্ধ হয়। আজাদ কামাল বীর বিক্রমসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছিলেন। মির্জাপুরে রাজাকার কমান্ডার ছিলেন সদরের মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ। ৩ এপ্রিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান-সাটিয়াচড়ায় পাকসেনারা আসামাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা নর ঘাতকদের উপর গুলি চালায়। এই সম্মুখ যুদ্ধে ১০৭ জন মুক্তিপাগল বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং ইপিআর নিহত হয় ২৩ জন। ৩৫০ জন পাকবাহিনী হতাহতের পর গোড়ান-সাটিয়াচড়া মুক্ত হলেও পাকসেনারা ঘাটি করে বসে মির্জাপুর উপজেলা সদর, মির্জাপুর সাহাপাড়া, বাংগলা, তরফপুর, ভড়রা ও নরদানা গ্রামে। পাকসেনারা আশেপাশের গ্রামে লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ করে নিরীহ শতাধিক বাঙালিকে হত্যা করে। ৭ মে দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা, তার একমাত্র ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা এবং ৮ মে থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল হোসেনের বৃদ্ধ পিতা জয়নাল সরকার ও মাজম আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মির্জাপুর ও আন্ধরা গ্রামের রাখাল চন্দ্র সাহা, সুদাম চন্দ্র সাহা, নিতাই মেম্বার, পান্না লাল, জগবন্ধু রায় সহ শতাধিক নারী-পুরুষকে পাক-হানাদার বাহিনী এবং এদেশীয় দোসররা হত্যা করে লাশ লৌহজং নদীতে নিক্ষেপ করে। ১২ ডিসেম্বর রাতে বীরযোদ্ধারা মির্জাপুরের বংশাই, লৌহজং নদীর দুই পাশ ও চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল সম্মুখ যুদ্ধ। ১৩ ডিসেম্বর মুক্ত হয় মির্জাপুর। ১৩ ডিসেম্বর মির্জাপুর মুক্ত হলেও শহীদদের গণ কবর আজও চিহ্নিত হয়নি এবং নির্মাণ হয়নি কোন স্মৃতি ফলক।
 
৩ এপ্রিল মির্জাপুর উপজেলার গোড়ান-সাটিয়াচূড়া নামক স্থানে ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ১ম প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্মুখীন হয় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান-সাটিয়াচড়া গ্রামে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাসহ ইপিআর, পুলিশ ও নর-নারী সহ ১০৬ জন বাঙালি শহীদ হন। দেশ স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও রাজধানী ঢাকার বাইরে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের স্থান গোড়ান-সাটিয়াচড়ায় বধ্যভূমিতে শহীদদের গণকবর সংরক্ষণ করা হয়নি।
 
এদিকে ঢাকার বাইরে মির্জাপুরে এই প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের স্থানে দীর্ঘ ৪৬ বছরেও বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও গণ কবরের স্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মাণ হয়নি স্মৃতিফলক। তবে ৩ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীনতার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ স্মৃতিসংসদ গোড়ান, সাটিয়াচুড়া ও পাকুল্যা গ্রামবাসী প্রতিবছর দিবসটির স্মরণ করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। জামুর্কী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী এজাজ খান চৌধুরী রুবেল, স্মৃতি সংসদের সভাপতি গোলাম সওজব পাওয়ার চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম মোজাহিদুল ইসলাম মনির মির্জাপুরের গোড়ান- সাটিয়াচুড়ায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের স্থানে গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন।
 
এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সড়ক পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একাব্বর হোসেন এবং মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত সাদমীন জানিয়েছেন, মির্জাপুরে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন ও গণকবরগুলো সংরক্ষণ করে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণসহ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
 
ইত্তেফাক/জামান