বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তের ছোট্ট একটি জেলা মেহেরপুর। এ জেলার রয়েছে প্রায় ২ হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বিশেষত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনায় মেহেরপুরের মুজিবনগর সূতিকাগারের ভূমিকা পালন করায় এ জেলার ইতিহাস হয়েছে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। সেই মুজিবনগরের স্মৃতি বিজড়িত মেহেরপুর বাংলাদেশের জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রাচীন আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলের গড়ে উঠেছে নানান স্থাপনা। তারই উল্লেখযোগ্য কয়েকটির কথা তুলে ধরা হলো।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ: মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুর প্রাক্কালে মেহেরপুরের মুজিবনগর থানার বৈদ্যনাথ তলার গ্রামে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার অর্থাৎ 'মুজিবনগর সরকার' শপথ গ্রহণের স্থানে নির্মিত স্মৃতিসৌধ।
ভবানন্দপুর মন্দির: মেহেরপুর জেলার প্রত্ন অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দিরটি। মন্দিরটির স্থাপত্য শৈলী দেখে অনেকে এটিকে বৌদ্ধ মন্দির হিসেবে অনুমান করে থাকেন। কিন্তু এটি হিন্দু মন্দির।
আমদহ গ্রামের স্থাপত্য নিদর্শন: মেহেরপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন নিদর্শন মেহেরপুর শহর থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত আমদহ গ্রামের স্থাপত্য কীর্তি। আমদহ গ্রামের এই স্থাপত্য শৈলীর ধ্বংসাবশেষকে রাজা গোয়ালা চৌধুরীর সাথে বগা দস্যুদের যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত আবাসস্থল বলে মাসিক পত্রিকা সাধক এর ১৩২০ (১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা) সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় এক বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই প্রত্নস্থানের চারিদিকে ছিল পরিখা, কিন্তু পরিখার বেষ্টনীতে কোন প্রাচীর ছিল না। এখন এই প্রত্নস্থানের কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এখানকার মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা একটি প্রত্মস্তম্ভ পুরাতন জেলা প্রশাসক ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে।
আমঝুপি নীলকুঠি: নীল চাষ ও নীলকরদের দীর্ঘ ইতিহাস মেহেরপুর বুকে জড়িয়ে রেখেছে। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত জন ফিলিপস্- এর নীলচাষ বিষয়ে রচিত গ্রন্থে বলা হয়েছে যে মশিয়ে লুই বান্নো বা বোনার্দ নামক জনৈক ফরাসি ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রথম নীল চাষ শুরু করেছিলেন। আমঝুপি নীলকুঠি ১৮১৫ সাল অথবা এরও কিছুকাল পরে স্থাপিত হয়েছে।
ভাটপাড়ার নীলকুঠি, সাহারবাটি: ১৮৫৯ সালে স্থাপিত ধ্বংস প্রায় এই নীলকুঠিটি ইট, চুন-শুরকি দ্বারা নির্মাণ করা হয়। এর ছাদ লোহার বীম ও ইটের টালি দিয়ে তৈরি। এই কুঠির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাজলা নদী।
শেখ ফরিদের দরগাহ: মেহেরপুর জেলার সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ গ্রাম হল বাগোয়ান। ইতিহাস প্রণেতা ড. ইরফান হাবিরের লেখায় ভারতচন্দ্র বায়গুনব্দর এর অন্নদা মঙ্গল কাব্যে 'ক্ষীতীশ বংশাবালি চরিতাং' গ্রন্থে এ গ্রামের কথা বলা হয়েছে। এ গ্রামে দরবেশ ফরিদের দরগাহ।
সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির: মেহেরপুর শহরের বড়বাজারে অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী কালি মন্দিরটিকে স্থানীয় হিন্দুরা জেলা কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে গণ্য করে। জেলার সর্ব প্রাচীন এই মন্দিরটি ইতিহাসের কোন সোনালি অধ্যায়ে স্থাপিত হয়েছে তা জানা যায় না। তবে অনুমান করা হয় রাজা গোয়ালা চৌধুরী কিংবা তার পরবর্তী বংশধরেরা যশ প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রত্যাশায় এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু মন্দিরের দেওয়ালে উৎকীর্ণ রয়েছে বাংলা ১৩৩২ সনে প্রফাত গোপাল সাহার স্ত্রী পাচু বালা দাসী মন্দিরটি নির্মাণ করেন। মন্দিরের ভিতরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বালা দেবীর বিগ্রহ। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-হানাদার বাহিনী তাদের দোসররা এই মন্দির আক্রমণ করে এবং এর অভ্যমত্মরে অধিষ্ঠিত বালী মূর্তিটি গুড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর স্থানীয় হিন্দুরা পুনরায় বিগ্রহ স্থাপন করে এবং নিয়মিত পূজা অর্চনা শুরু হয়। প্রতি বছরই এখানে কালী পূজা, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পজা অনুষ্ঠিত হয়। বৈশাখ মাসের শেষ সংক্রান্তিতে এই মন্দিরকে ঘিরে বসে বৈশাখ সংক্রান্তির মেলা। সংক্রান্তির মেলার জৌলুস আজ আর নেই; তবে নিজ ও সমাজের মঙ্গল কামনায় প্রতিবছর মন্দির প্রাঙ্গণে চলে পাঠা বলিদান।
মেহেরপুর পৌর কবর স্থান: বহু বছর পূর্ব থেকে মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়ক সংলগ্ন স্থানে স্থাপিত হয় পৌর গোরস্থান। পূর্বে পৌর গোরস্থান অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। উক্ত প্রাচীর কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেলে ১৯৯৩ সালে সাবেক পৌর মেয়র, মো. মোতাছিম বিল্লাহ মতু পৌর মেয়রের আসন অলংকৃত করার পর পৌর পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় সুদর্শন প্রাচীর নির্মাণসহ প্রাচীরের গায়ে টাইলস ও পাথরের উপর আরবি এবং বাংলা কোরআন, হাদিসের বাণী লিখেন। এছাড়া এ কবরস্থানের সমস্ত জায়গায় ফুলের বাগান দ্বারা সজ্জিতকরণসহ কবর স্থানের মধ্যে ওজুখানা ও মসজিদ নির্মাণ করেন।
মেহেরপুর শহীদ স্মৃতিসৌধ: ১৯৭১ সালে যে সব বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং যারা পাকিস্তানি সৈনিকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মেহেরপুর পৌর কবরস্থানের পাশে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে প্রতি বছর মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে মাল্যদান করে তাদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করা হয়ে থাকে। মেহেরপুর জেলার ঐতিহ্য বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তের ছোট্ট একটি জেলা মেহেরপুর। এ জেলার রয়েছে প্রায় দু'হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বিশেষত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনায় মেহেরপুরের মুজিবনগর সূতিকাগারের ভূমিকা পালন করায় এ জেলার ইতিহাস হয়েছে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। সেই মুজিবনগরের স্মৃতি বিজড়িত মেহেরপুর বাংলাদেশের জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ইত্তেফাক/জামান
