নির্বাচন-প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ২২:০৩

কথাটা বার্নার্ড শ’ না বার্ট্রান্ড রাসেলের তা ঠিক মনে পড়ছে না। এজন্যে পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। তবে কে বলেছেন তা বড় নয়, কথাটাই বড়। তাতে বলা হয়েছে, “স্বামী বাসর রাতে নববধূকে যেসব প্রোমিস করে আর নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো যে ইলেকশন প্রোমিস করে তা বিশ্বাস করলে ঠকতে হয়।” কথাটা যে কত নিষ্ঠুর সত্য, তা বাংলাদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে জানে। উদ্ধৃত কথাটা মনে পড়ল বিএনপি-জামায়াতের এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত ঐক্যফ্রন্টের ইলেকশন-প্রোমিসগুলো দেখে।

ঢাকায় কাগজে ঢালাওভাবে এই প্রোমিস বা অঙ্গীকারগুলো প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, এগুলো প্রধান বিরোধী জোটের ইলেকশন প্রোমিস এবং তা তাদের ইলেকশন মেনিফেস্টোর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতিশ্রুতিগুলো পাঠ করে মনে হলো, বাসর রাতে স্বামীও নববধূকে এত প্রতিশ্রুতি দেয় না। আওয়ামী লীগের নির্বাচন-ইশতেহার এখনো দেখিনি। অনুমান করি, তাতে দেশকে আরও উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকবে।

বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা জোটেরও নির্বাচন-ইশতেহার হাতে পাইনি। তবে সিপিবি নেতাদের বক্তব্য পাঠ করে দেখা যাচ্ছে, তারা শোষণহীন সমাজ গঠনের জন্য সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। ভারতের বামফ্রন্টও শোষণহীন সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক সময় কয়েকটি রাজ্যে সরকার গঠন করেছিল। যেমন পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কেরল। ত্রিশ বছরের বেশি রাজত্ব করেও পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সামান্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বরং পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসী শাসনের ধারাতেই বামফ্রন্টের শাসনে একই ধরনের শোষণ ও শাসন চলেছে। এমনকি সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে বাম সরকারের হাতে কৃষক হত্যা পর্যন্ত হয়েছে। নির্মমভাবে কৃষক আন্দোলন দমন করা হয়েছে।

সুতরাং বাংলাদেশের ভোটদাতারা এ যুগে রাজনৈতিক দলের এসব প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে ভোট কেন্দ্রে যাবেন তা মনে হয় না। বাংলাদেশের নববধূরাও বাসর রাতে স্বামীর দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি আজকাল বিশ্বাস করেন কি? বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্বাচন প্রতিশ্রুতির যেসব কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তার একটিও যদি সত্য হয়, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের উচিত বিনা নির্বাচনেই বিএনপি-জামায়াত জোটকে আবার ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়া। তাহলে এই জোট এমন গণতন্ত্র দেশে চালু করবে যার নজির ব্রিটেন, আমেরিকার মতো পশ্চিমা দেশেও নেই।

কিন্তু দেশের মানুষ বিএনপি-জামায়াতের অতীতের শাসনামল দেখেছে। ধানের শীষ চিহ্নিত গণতন্ত্রের চেহারা দেখেছে। দেখেছে, গ্রামের দরিদ্র কৃষক সরকারের কাছে সার চাইতে এসে তাদের ১৮ জনকে নির্মমভাবে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছে। বিএনপি সরকারের বিরোধিতা করায় আওয়ামী লীগের অসংখ্য শীর্ষ নেতাকে মর্মান্তিক হত্যার শিকার হতে হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির লেখক হুমায়ুন আজাদকে ছোরার আঘাতে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে  হয়েছে। জিয়াউর রহমানের এক প্রতিমন্ত্রীর সামান্য সমালোচনা করায় জহুর হোসেন চৌধুরীর মতো দেশের এক বরেণ্য সম্পাদককে মাঝ রাতে হাতে হাতকড়া পরিয়ে জেলে নেওয়া হয়েছিল। ২০০১ সালে নির্বাচনে ধানের শীষের জয়লাভের পর পূর্ণিমা শীলদের মতো অসংখ্য কুমারী নারীকে পৈশাচিক গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল।

তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। তাতে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা হবে। ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের কাছে বিএনপি-জামায়াত জোটের নতুন নেতা ড. কামাল হোসেন নালিশ করেছেন। বর্তমান হাসিনা সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি বর্তমানে যে জোটের নেতা, তাদের শাসনামলে মাগুরা উপনির্বাচন এবং ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সাধারণ নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও অবাধ হয়েছিল এবং সেই নির্বাচনের পরই গণবিস্ফোরণে কেন খালেদা জিয়াকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, সেকথা ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে জানিয়েছিলেন কি?

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রচার চালানো হয়েছিল, তিনি নিহত হয়েছেন তার প্রধান কারণ— তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে সর্বক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন পদ্ধতি প্রবর্তন করেছেন। একদলীয় শাসন প্রবর্তন করেছেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতো কালাকানুন চালু করেছেন। সংবাদপত্র দলন করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। যে অভিযোগগুলো ছিল অপপ্রচার। তবু যদি এগুলো সত্যও হয় তাহলে প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশে কি সংসদীয় প্রথা ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, না জিয়াউর রহমান সর্বক্ষমতাশালী প্রেসিডেন্ট হয়ে  বসেছিলেন। তিনি সংসদীয় প্রথা চালু করে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন এর চাইতে বড় মিথ্যা আর কিছু নেই। তিনি পাকিস্তানের আইয়ুবের কায়দায় একটি পুতুল পার্লামেন্ট গঠন করেছিলেন, সেখানে গৃহপালিত বিরোধী দলীয় সদস্য রেখেছিলেন— যাদের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন বা কেন্দ্রীয় বাজেট ভোট দ্বারা প্রত্যাখ্যানের কোনো অধিকার ছিল না। সংবাদপত্রের উপর ছিল অঘোষিত কঠোর সেন্সর প্রথা। সরকারের সমালোচনা দূরের কথা, বঙ্গবন্ধুর নাম, ছবি পর্যন্ত ছাপা যেত না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্সিয়াল প্রথা চালু রাখতে চেয়েছিলেন। প্রচণ্ড গণদাবির মুখে সেই ইচ্ছা তাকে ত্যাগ করতে হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু আমলের যে স্পেশাল অ্যাক্টের এত নিন্দা, তা বাতিল করা দূরের কথা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনামল পর্যন্ত তা বজায় রাখা হয়েছে। সম্ভবত এখনো আছে। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষী বাহিনী গঠনের জন্য নিন্দা করা হয়। বিএনপি কি সন্ত্রাস দমনের নামে তার চাইতেও ভয়ানক কাজ করেনি? বিএনপির আমলে বাক-স্বাধীনতা ও মিডিয়ার স্বাধীনতা কতটুকু ছিল সে সম্পর্কে লেখা কালি-কলমের অপচয়। এখনতো শেখ হাসিনাকে মিডিয়ায়, টেলি টকশো’তে যথেচ্ছ সমালোচনা করা হয়। বিএনপি আমলে কি ছিল?

অন্যের অভিজ্ঞতা নয়, নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। পঞ্চাশ বছর ধরে সংবাদপত্রে কলাম লিখি। বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করেও লিখেছি, কোনো সম্পাদক আমাকে বাধা দেননি, বিএনপি আমলে একটি পত্রিকার সম্পাদক আমাকে বারংবার সতর্ক করে দিতেন, আমি যেন তারেক রহমানের কোনো সমালোচনা দূরে থাক, তাকে কটাক্ষ করেও কোনো কথা না লিখি। মাদাম জিয়াকে বিদেশ থেকে ডক্টরেট এনে দিতে পারেননি বলে (কারণ তিনি ম্যাট্রিক পাসও নন) এক উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসারকে জেলের ভাত পর্যন্ত খাওয়ানো হয়েছে।

বিএনপি-জোটের নির্বাচন-প্রতিশ্রুতিগুলো খবরের কাগজে পড়েছি এবং মনে মনে হেসেছি। দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, অবাধ বাক-স্বাধীনতা থাকবে, প্রশাসনে দলতন্ত্র থাকবে না, কঠোর হাতে দুর্নীতি বন্ধ করা হবে, শোষণ-বঞ্চনা থাকবে না, মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হবে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হবে ইত্যাদি “মিষ্টি মিষ্টি বাত” অনাদিকাল থেকে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইলেকশন মেনিফেস্টোতে লিখে আসছে এবং ক্ষমতায় গিয়ে তা ভঙ্গ করছে। বিলাতে টোরি গভর্নমেন্ট ইমিগ্রেশন আইন শক্ত করলে লেবার পার্টি তার তীব্র প্রতিবাদ করে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেই লেবার দলই টোরিদের ইমিগ্রেশন আইন আরও শক্তভাবে বহাল রাখে।

এর জন্য সর্বতোভাবে রাজনৈতিক দলগুলো দায়ী নয়। দায়ী দেশের স্থায়ী এসটাবলিসমেন্ট। উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই এখন গণতন্ত্র স্থায়ী এস্টাবলিসমেন্টের হাতে বন্দি। আমেরিকায় এই এস্টাবলিসমেন্টকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ইনভিজিবিল গভর্নমেন্ট বা অদৃশ্য সরকার। সবদেশেই ভিজিবল রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু এই অদৃশ্য সরকারের পরিবর্তন হয় না। যে কোনো দেশে যে কোনো রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দেশ শাসনে তাদের যত ভালো কর্মসূচি থাকুক, এস্টাবলিসমেন্ট নানা কৌশলে তা ব্যর্থ করে দেয়। তাদের কথামতো নির্বাচিত সরকারকেও চলতে বাধ্য করে।

ড. কামাল হোসেনরা অনেক বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু একথাটা হয়ত বোঝেন না অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেন, সরকার পরিবর্তন বা সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই কোনো দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র আসে না। যদি প্রতিক্রিয়াশীল ও গণবিরোধী কায়েমি স্বার্থের প্রতিভূ যে এস্টাবলিসমেন্ট তা পরিবর্তন অথবা সংশোধন করা না যায়। আবার নির্বাচন প্রক্রিয়া যত সুষ্ঠু ও অবাধ হোক— যদি রাজনৈতিক দল সত্ ও সঠিক প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেয়, এবং নির্বাচকমণ্ডলী ভোট দানে সঠিক প্রার্থী বেছে নিতে ভুল করে তাহলেও কোনো দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না।

বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করার পর শাসনব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক আমলের কায়েমি স্বার্থ তথা গণবিরোধী এস্টাবলিসমেন্টের উচ্ছেদ ঘটাতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন জনগণের সঠিক প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন কাঠামো গড়ে তুলতে। সেজন্যেই প্রতিবিপ্লবী চক্রের হাতে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তার কন্যা শেখ হাসিনা বৈপ্লবিক পথে নয়, ধীর সংস্কারের দ্বারা এই এস্টাবলিসমেন্টের চরিত্র গণমুখী করার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টার সাফল্যের উপর দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে ড. কামাল হোসেনেরা বিএনপি-জামায়াতের কাঁধে চড়ে গণতন্ত্রের নামে দেশে যা চাচ্ছেন, তা হলো গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রবিরোধী এস্টাবলিসমেন্টের হাত শক্ত করার ব্যবস্থা করা। হাসিনা সরকার এবারের নির্বাচনে ক্ষমতা হারালে গণতন্ত্র আসবে না। দেশ গণতন্ত্রের পথে যেটুকু এগিয়েছে, সেখান থেকে আবার পিছিয়ে যাবে। ২০০১ সালে কামাল সাহেবেরা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজে সাহায্য জুগিয়ে যেমন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শাসন ডেকে এনেছিলেন, এবার তাদের চেষ্টা সফল হলে তার চাইতেও ভয়ানক শাসন দেশে ডেকে আনবেন। তখন ইরানের মৌলবাদী বিপ্লব সফল হওয়ার পর তথাকথিত উদারপন্থি বনি সাদর এবং তার দলবলকে যেমন ইরান থেকে পালাতে হয়েছিল, বাংলাদেশের কামাল হোসেন সাহেবদের ভাগ্যে সেই একই পরিণতি ঘটবে।

আমার একান্ত আশা, বাংলাদেশে ড. কামালদের এবারের চক্রান্ত সফল হবে না।

n ২৪ নভেম্বর, শনিবার ২০১৮