রাজধানীর হকারদের ঘিরে চাঁদাবাজির বড় সিন্ডিকেট

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:১৬
 
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে রাজধানীর রাজপথ, ফুটপাত ও গলিপথে প্রতিদিন লক্ষাধিক হকার জীবন ও জীবিকার তাগিদে নেমে আসে। পসরা সাজিয়ে বসে থরে থরে। তাদের এই ভাসমান বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়তই নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যার মধ্যে বড় বিষফোঁড়া চাঁদাবাজি।
 
শুধু ঢাকার হকারদেরকে ঘিরে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে। আর এই চাঁদার টাকা আদায় করছে নগরীর তিন শতাধিক অবৈধ টোল আদায়কারী যারা ‘লাইনম্যান’ নামে পরিচিত। তারা পুলিশের এক শ্রেণির মনোনীত সোর্স। এরাই পুলিশ ও রাজনৈতিক মহলের সাথে আঁতাত করে হকারদের নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের বিরুদ্ধে হকার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট থানা ও আদালতে একাধিক মামলা করেও প্রতিকার পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ইত্তেফাককে বলেছেন, পুলিশ বা পাবলিক যেই এই চাঁদাবাজির সাথে জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
জানা গেছে, চাঁদাবাজির বিশাল অর্থ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের এক শ্রেণির প্রভাবশালী নেতাকর্মী ও হকার সংগঠনের নেতারা। এর বিনিময়ে লাইনম্যান বা চাঁদা আদায়কারীদের আর্থিক সহযোগিতা করে থাকে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
 
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ‘লাইনম্যান’ নামধারী চাঁদা আদায়কারীদের বিরুদ্ধে মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, যাত্রাবাড়ী, কোতোয়ালি, সুত্রাপুর, বংশাল, লালবাগসহ বিভিন্ন থানায় ২৫টির ও অধিক মামলা রয়েছে। তবে পুরান ঢাকায় এই চাঁদাবাজির গন্ডি সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সেখানে এটি বেপরোয়াভাবে রূপ লাভ করেছে। জামিন নিয়ে চাঁদাবাজির মামলার আসামিরা এখনও চাঁদাবাজি করছে। তাদেরকে সহায়তা-সমর্থন দিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু পুলিশের এসি, ওসি, পিআই, টিআইসহ রাজনৈতিক দলের অসাধু নেতাকর্মী ও হকারদের কয়েকটি সংগঠনের নেতারা। পুলিশের চোখের সামনেই এরা নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। এরা এতটাই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে যে, মামলা করলে বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে থাকে।
 
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের পাশের মার্কেটের সহস্রাধিক হকারের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে সাইফুল ইসলাম ও তার ৩ সহযোগী, বায়তুল মোকাররম জিপিও লিংক রোডে হলিডে মার্কেটে চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিচ্ছে খোকন মজুমদার, আবুল হাসেম, মজিবর, পোটল, নসু, হারুন অর রশীদ ও তার সহযোগীরা, বায়তুল মোকাররম উত্তরগেট এলাকায় দুম্বা রহিম, সাজু, শাপলা চত্বরে আরিফ চৌধুরী, পল্টন এলাকায় দুলাল মিয়া ও তার সহযোগীরা, গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্স ও গুলিস্তানের রাস্তায় মো. আমিন মিয়া, সাহিদ ও লম্বা হারুন, গুলিস্তানের জুতা পট্টিতে সালেক, গোলাপশাহ মাজারের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে ঘাওড়া বাবুল ও শাহীন, ওসমানী উদ্যানের পূর্ব ও উত্তর অংশে লম্বা শাজাহান, গুলিস্তান খদ্দর মার্কেটের পশ্চিমে কাদের ও উত্তরে হান্নান, পূর্বে সালাম, আক্তার ও জাহাঙ্গীর, গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনের রাস্তায় লাইনম্যানদের সর্দার বাবুল, সুন্দরবন স্কোয়ার মার্কেটের উত্তর পাশের রাস্তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মো. জজ মিয়া, সুন্দরবন স্কোয়ার মার্কেটের পূর্ব পাশের রাস্তার নেতৃত্ব দিচ্ছে মো. সেলিম মিয়া, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে মো. আলী, আবদুল গফুর ও বাবুল ভুঁইয়া, শাহবাগে ফজর আলী, আকাশ, কালাম ও নুর ইসলাম, যাত্রাবাড়িতে সোনামিয়া, তোরাব আলী, মান্নান, জুরাইন-পোস্তগোলায় খায়রুল, সিরাজ তালুকদার ও গরু হানিফ, লালবাগে আব্দুস সামাদ, চানমিয়া ও ফিরোজ, মিরপুরে -১ এ ছোট জুয়েল, আলী, বাদশা ও মিজান, মিরপর-১১এ আবদুল ওয়াদুদ, শফিক ও হানিফ, গুলশানে হাকিম আলী, কুড়িলে আবদুর রহীম ও নুরুল আমিন, এয়ারপোর্টে আকতার, মনির, ইব্রাহিম, জামাল ও বাবুল, উত্তরায় টিপু, নাসির ও হামিদ । এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা রয়েছে।
 
গুলিস্তানের হকার জাফর আহমেদ জানান, ব্যবসার ধরন বুঝে জনপ্রতি একশ থেকে চারশ করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। যারা চাঁদা দিতে অস্বীকার করে তাদেরকে লাঞ্ছিত করা হয় এবং ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, শুধুমাত্র ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়ই কমপক্ষে ৬০ হাজার স্থায়ী হকার নিয়োজিত আছে। আর সারা ঢাকা সিটিতে কর্মরত আছে লক্ষাধিক। তাদের কাছ থেকে গড়ে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। এই চাঁদাবাজি প্রতিরোধে বিভিন্ন থানা ও আদালতে এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বিশাল অঙ্কের চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এর সাথে আছে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী নেতা-কর্মীও।
 
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল ইত্তেফাককে বলেন, মহানগরীর হকারদের ঘিরে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির বাণিজ্য হয় এমন কথা শুনেছি। তবে আমার জানামতে এই ঘটনার সাথে সিটি করপোরেশনের কেউ জড়িত না।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর