পাল্টে গেছে বর্ষা ঋতু আছে তবু বিরহযাপন

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:৫৩

১৪২৬ বঙ্গাব্দ শুরু হলো। পেছনে ফেলে আসা হাজার বছরের বাঙালি জীবনে বর্ষা ঋতুর (আষাঢ়-শ্রাবণ) হিসাব মেলাতে গেলে দেখা যাবে আমাদের হূদয়ের গোপন কন্দরে আসীন চিরআরাধ্য এই ঋতুটির ঘটেছে অনেক রূপান্তর। কেবল গেল বছর অর্থাত্ ১৪২৫ সালের আষাঢ় ছিল রোদের উত্তাপে দগ্ধময়। বাদল দিনে এসময় কদম ফুল ফুটলেও বৃষ্টির দেখা মেলেনি। কাকভেজা রিমঝিম বৃষ্টি ছিল না। বর্ষণস্নিগ্ধ সকালের আবির্ভাব ঘটেনি উদ্দীপক ভাব হয়ে; কলস্বরে বারি ঝরে পড়েনি। ঝিরিঝিরি হাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে শাল-মহুয়া-কেয়া আর এক পায়ে দাঁড়িয়েছিল তমাল তরু বিমনা হয়ে। আমরা তো আষাঢ়ের বৃষ্টির পাগলামি দেখতে চাই। অথচ প্রকৃতি ছিল রুদ্রমূর্তির তেজে দীপ্তমান। মনে করিয়েছিল চৈত্রের কথা। ছিল দিন-রাত প্রচণ্ড ভাপসা গরম। সর্বত্রই বৃষ্টির জন্য হা-হুতাশ চলেছে। পক্ষান্তরে বছরের শেষে বিগত চৈত্র মাসে ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি হয়েছে প্রায় প্রতিদিনই। আসলে ক্রমাগত অস্বাভাবিক ও বৈরী আচরণ করছে আবহাওয়া। বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নিত্যনতুন দুর্যোগ, দুর্ভোগ ও সংকট তৈরি হচ্ছে। ফসলের উত্পাদন ব্যাহত এবং উত্পাদনব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। খামখেয়ালি আচরণ, অস্বাভাবিক মতিগতি এবং চরম ভাবাপন্ন রূপে দেখা দিচ্ছে প্রকৃতি। চিরায়ত ষড়ঋতুর আদি চরিত্র গেছে পাল্টে। পঞ্জিকার ছক অনুসারে বর্ষায় বৃষ্টি ঝরছে কম। অথচ প্রাক-বর্ষায় ও বর্ষা-উত্তর অকালে অঝোর বর্ষণে দীর্ঘায়িত হচ্ছে বর্ষাকাল। বছর বছর অনাবৃষ্টি ও খরার প্রকোপ বেড়ে গিয়ে মরুময়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে বরেন্দ্রভূমি সমেত দেশের সুবিশাল জনপদ। অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ঘন ঘন প্রবল সামুদ্রিক জোয়ারে ও অতিবর্ষণে ভাসছে। আগের তুলনায় ছোট ছোট জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বেড়েছে। গরম দীর্ঘায়িত হলেও শীতের দাপট চলছে অল্প কিছুদিন মাত্র। আষাঢ়-শ্রাবণে যেমন বর্ষা নেই তেমনি অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ মাসে আগের মতো হাঁড় কনকনে শীতের উপস্থিতি স্বল্পকালীন। উপরন্তু শরত্, হেমন্ত ও বসন্ত আলাদা করে জনজীবনে তেমন আর অনুভূত হচ্ছে না। অথচ শেষোক্ত এই ঋতুগুলোর আলাদা মহিমা আছে শিল্প-সাহিত্যে। 

অবশ্য আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় আচার-আচরণের সঙ্গে বর্ষা ঋতুর ছিল গভীর সম্পর্ক। যেমন, একদা বর্ষাকালেই বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ‘বর্ষাব্রত’ উত্সবের সূচনা। একালেও বৌদ্ধ ধর্মের রীতিতে শ্রাবণের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয় বর্ষাবাস। রীতি অনুসারে খাবার থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে সংযমের উদ্দেশ্যে এ ‘বর্ষাব্রত’ বা বর্ষাবাস পালন করা হয়। এর তাত্পর্য এরকম—‘গ্রীষ্মের তাপদাহের পর বর্ষার আগমন ঘটে। বর্ষার অঝোর ধারার বর্ষণসিক্ত ধরণীতে নব পত্র-পল্লবের আবির্ভাব ঘটে। নতুন গাছগাছালি ও লতা-গুল্মের অঙ্কুরোদ্গম হয়। নদ-নদীতে বান ডাকে। তাপদগ্ধ বনভূমিতে সবুজের সমারোহ দেখা দেয়। কৃষাণ-কৃষাণি জীবন-ধারণোপযোগী শস্য-বীজ বোনার তত্পরতায় মনপ্রাণ ঢেলে দেয়। ঠিক এই ঘোর বর্ষার সময় মহামানব বুদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য অটুট রাখার লক্ষ্যে ভিক্ষুদেরকে যত্রতত্র ঘোরাঘুরি থেকে বিরত রেখে বর্ষার তিন মাস ‘বর্ষাব্রত’ অধিষ্ঠানপূর্বক নিজ-নিজ বৌদ্ধমন্দিরের অভ্যন্তরে ধ্যান-মৌন অবস্থায় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার লাভের প্রচেষ্টায় নিরত থাকার বিধান প্রজ্ঞাপ্ত করেছিলেন। বর্ষার এই তিন মাস বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান ইংরেজিতে Rain-Retreat নামে বৌদ্ধ-বিশ্বে বিপুলভাবে সমাদৃত ও আজ অবধি এই বিষয়টি জীবন-ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিপালিত হয়ে আসছে।’ ভগবান বুদ্ধের নির্দেশ ছিল—‘হে ভিক্ষুগণ! বর্ষাবাস আরম্ভ করিয়া প্রথম তিন মাস (শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন) অথবা শেষের তিন মাস (ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক) একস্থানে বাস না করিয়া পর্যটনে গমন করিতে পারিবে না, যে গমন করিবে তাহার ‘দুক্কট’ অপরাধ হইবে।’ অর্থাত্ প্রত্যেক ভিক্ষুকেই বর্ষাবাস পালন করতে হয়, না করলে ‘দুক্কট’ অপরাধী। বর্ষাবাস পালনের সঙ্গে অধিষ্ঠানব্রত, অর্থাত্ ধ্যান, সমাধি ও বিদ্যাভ্যাসের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয়। বর্ষাবাসকালীন ভিক্ষুসংঘের পাশাপাশি বৌদ্ধ গৃহী বা উপাসক-ঔপাসিকারাও প্রতিটি ‘উপসথ’ তিথিতে অষ্টশীল বা উপসথ শীল পালন করে অধিষ্ঠান ব্রত যাপন করেন এবং শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করেন।  

রাজকুমার সিদ্ধার্থ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গৃহত্যাগ করেন। আবার বুদ্ধত্ব লাভের পর এ পূর্ণিমা তিথিতে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যের কাছে তিনি তাঁর নবধর্ম প্রচার ও ধর্মচক্র প্রবর্তনসূত্র দেশনা করেন। পরে একই পূর্ণিমা তিথিতে তিনি তাঁর প্রয়াত মাতৃদেবীকে দর্শন ও সদ্ধর্ম দেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। এ পূর্ণিমাতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস অধিষ্ঠান গ্রহণ করে থাকেন। গৌতমবুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভের পরবর্তী ৪৫ বছর বর্ষাবাস বা বর্ষাঋতু অতিবাহিত করার সাল ও স্থানসমূহের বিবরণ পাওয়া যায় বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থে। তাতে দেখা যায় শ্রাবন্তী ও রাজগৃহেই বুদ্ধের বর্ষাবাস যাপনের সংখ্যা বেশি। এই স্থানগুলোকে কেন্দ্র করেই বুদ্ধ অন্যান্য স্থানে যাতায়াত করতেন। বুদ্ধ শেষ বর্ষাবাস যাপন করেন বজ্জি রাজ্যের বৈশালিতে এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন মল্লরাজ্যের কুশীনারায়। বজ্জি রাজ্যের বৈশালি থেকে তিনি মল্লদের কুশীনগর গমন করেছিলেন। বুদ্ধের সময় প্রাচীন ভারতের গয়া, উরুবেলা, রাজগৃহ, নালন্দা, পাটলিপুত্র, একনালা, শ্রাবস্তী, সাকেত, উজ্জয়িনী প্রভৃতি স্থান বর্ষাবাস যাপনের জন্য খুবই উপযোগী ছিল। বর্ষাবাসের সময় গুহাবাসের মধ্যে গৃধ্রকূট, চোরপ্রপাত, ইসিলি, সপ্তপর্ণী, সীতবন, সপ্পসোন্ডিক পভার ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। বর্ষাবাস,  প্রবারণা পূর্ণিমা ও  কঠিন চীবর দান এই তিনটি উত্সব পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বর্ষাব্রত পালন না করলে কোনো ভিক্ষু কঠিন চীবর গ্রহণ করতে পারেন না, আবার কঠিন চীবর গ্রহণ করতে না পারলে ভিক্ষুবিনয় অনুসারে ভিক্ষুগণ বহুবিধ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। বর্ষাবাস পালনের অন্য একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তা হলো এই বর্ষাব্রত গণনা করেই ভিক্ষুজীবনের বয়স নির্ধারণ করা হয়, অর্থাত্ জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ নির্ধারিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের রীতিতে আত্মত্যাগ অর্থাত্ সংযমের উদ্দেশ্যেই ‘বর্ষাবাস’কে তাঁরা বিগত দিনের পাপ তাপ ধুয়ে মুছে নিজেকে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে নিতেই পালন করেন। তাদের বিশ্বাস এ বর্ষাবাস উত্সবের মাধ্যমে দূর হবে সকল পাপ, পঙ্কিলতা, রোগব্যাধিসহ সকল সমস্যা। সকলের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে এমন কামনায় শুরু হয় বর্ষা উত্সব। ‘বর্ষা উত্সব’ কেবলই অনাবিল আনন্দের উত্সব।

দু হাজার বছর আগে রচিত বাল্মীকি ‘রামায়ণে’র সূত্রে আমরা দেখতে পাই, তখন বর্ষা আসত প্রবল সমারোহে। নীল মেঘের কোল থেকে বিদ্যুত্ স্ফুরিত হতো। প্রচুর বৃষ্টিপাতে শ্যামল ভূমি আপ্যায়িত হয়ে তৃণ-গুল্মে ছেয়ে যেত। ময়ূর-ময়ূরী আনন্দ-নৃত্যে মেতে উঠত, বৃষ্টির পর বনানী অপরাহ্নে সজীব দেখাত। সেসময় চিত্রকূট পর্বতে যখন বর্ষা নেমে এসেছে তখন সমস্ত বনভূমি মেঘচ্ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে আবৃত হয়ে গেছে। আর অবিরত বর্ষণ চলেছে চারিদিকে। অন্যদিকে মহাভারতের ঋষ্যশৃঙ্গের কাহিনিতে বৃষ্টির প্রসঙ্গটি নিগূঢ় সম্পর্কে বিজড়িত। সেখানে উর্বরতার প্রতীক ‘বৃষ্টি’। তবে বর্ষার প্রভাব নানান মাত্রায় আত্মপ্রকাশ করেছে মানবজীবনে। যেমন, দিল্লির সুলতানরা বর্ষা মৌসুমে বাংলা অভিযানে এসে নাকানি-চুবানি খেয়েছিল একটানা বৃষ্টির মধ্যে পড়ে। সম্রাট আকবরের ঘোড়সওয়ার বাহিনী বর্ষায় নাকাল হয়ে অভিযান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে বোঝা যায় মধ্যযুগে বর্ষার সময় নদ-নদী, মাঠ-ঘাট জলে পরিপূর্ণ হওয়ায় বর্গির লুণ্ঠনও থেমে যেত। এমনকি ১৯৭১ সালের বর্ষাকালে গেরিলা যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অপারেশন সফল করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কারণ জুলাই-আগস্ট মাস জুড়ে বর্ষার দাপট ছিল সহায়ক শক্তি। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী লিখেছেন, ‘এই মেঘ-বৃষ্টি-বর্ষণ একাত্তরে মিলেছিল। বাংলাদেশ জেগেছিল গেরিলার গরিমায়, মুক্তিযুদ্ধের মহিমায়। সেদিনের আকাশ অশ্রু বিসর্জনেও লাভ করেছিল অপার আনন্দ। বৃষ্টির বন্দনা করেছিল কোটি সন্তান। ভাতে মারব, পানিতে মারব যেন মিশে গিয়েছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইল। প্রতিটি ফোঁটার অবতরণকালে উচ্চারিত হয়েছিল, জয় বাংলা।’ (সৌরভ পত্রিকা, ২০১৫) ।  

২.

আগেই লিখেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চিরচেনা বর্ষা আজ পাল্টে গেছে। এ কারণে বিরূপ পরিবেশে বর্ষা যেন আজ ম্রিয়মাণ। টানা বর্ষণে নগরজীবনে নেমে আসে জলাবদ্ধতার আতঙ্ক আর গ্রামবাসী বন্যার শঙ্কায় কিংবা ভাঙনের দুশ্চিন্তায় দিন পার করে। অতীতে আষাঢ়ের বৃষ্টি আসত নতুনত্ব নিয়ে। চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের প্রখর তাপদাহ থেকে শীতলতা দিতে নিয়ে আসত শান্তির বরিষণ। হাজার বছর ধরে আষাঢ়ের বারিস্নাত হওয়ার রূপ বাংলার পরিচিত দৃশ্য ছিল। তুমুল বৃষ্টিধারা, নদীমাতৃক দেশের নদীর পূর্ণ যৌবন, নদ-নদীর ভাঙা-গড়া সবই বাংলাদেশের মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। আষাঢ়-শ্রাবণে মেঘ ও রৌদ্রের খেলা চলে। কখনো বা আকাশ লাল করে ঝরে রোদের উচ্ছ্বাস। খানিক পরেই মেঘের গর্জন। অন্ধকার হয়ে আসে চরাচর। ধান, চাল, খর আর শুকাতে দেয়া কাপড় গোছাতে ব্যস্ত হয় নারীরা। মেঘের গর্জন থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য চিন্তিত হয় কর্তারা; হঠাত্ বৃষ্টিতে ভিজে তারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। এজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’ এভাবে বর্ষা নিয়ে কবিতা লিখেছেন অসংখ্য কবি। তবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা তারও আগে মধ্যযুগের কবিরা বর্ষার যে সৌন্দর্য দেখে কবিতা রচনা করেছিলেন সেই প্রকৃতি আজও কি তেমনই আছে? এই কালে যে আবহাওয়া বিরাজ করছে তাতে সেদিনের সেই ঋতুর সঙ্গে আজকের প্রকৃতির মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ ষড়ঋতুর বাংলায় অতীতে বর্ষা ছিল সর্ববিস্তারী। তার কাছে প্রাচীন কবিরা অবনত হতো, আবেদন জানাত, আকুতির সুর ঝরে পড়ত পঙিক্তর পর পঙিক্তর স্তবকে। গীত-নৃত্যে আরাধনায় মুখরিত হতেন বাদ্যযন্ত্রীরা। বর্ষার কারণে যুগল জীবনে অভিসার দীর্ঘস্থায়ী হতো। বৃষ্টিতে মানুষের মন শীতল হয়, কিন্তু বিচ্ছেদ-বেদনা-বিরহ জাগ্রত হতো যূথবদ্ধ জীবনে দূরত্ব রচিত হলে।