শীতের কড়চা

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:৫৭

অতি তরুণ বয়সে লিখেছিলাম ‘শীতের চরাচর’ শিরোনামে একটি কবিতা। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আকুলতা শুভ্রতার জন্য’ এর প্রথম কবিতা ছিল সেটি। এত বছর পরে আজ নতুন করে কবিতাটি পড়তে গিয়ে মনে হলো কী করে এই বোধ আমার ভেতরে সঞ্চারিত হয়েছিল চার দশক আগে! সত্যিই তো শীত এক আশ্চর্য ঋতু। আমি প্রতীকী অর্থে শীতকে বিপর্যয় হিসেবে দেখেছিলাম। কবিতার কয়েকটি চরণ তুলে ধরলে এ আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা অনিবার্য মনে হবে।

‘শীতই একমাত্র ঋতু/ অন্তত আমার বোধে অন্য ঋতু নেই।/ যদিও গোলাপ ফোটে দক্ষিণ হাওয়ায়/ কোকিলের কুহুস্বরে মুখরিত হয়ে ওঠে সংসারী বাগান,/ বৃষ্টির নূপুরধ্বনি বেজে ওঠা আভাসে কখনো/ শ্রাবণ-মেঘেলা দিনে দেখেছি ময়ূর/ নাচের মুদ্রায় খুব আগ্রহে হঠাত্/ মেলেছে পেখম তার;/ আবার দেখেছি সেই চৈত্রের লকলকে রোদ/ ছড়াতে ছড়াতে লালা চাটছে সজীব শস্য/ লাবণ্যের উজ্জ্বল শরীর।/ তবু যেন গ্রীষ্ম নয় বর্ষা বা শরত্ নয়, বসন্তও নয়/ আমার অস্তিত্বে এই চরাচর শুধু সেই শীতার্ত প্রান্তর—/ ক্ষুধাও ও তৃষ্ণার মতো অপ্রাপ্তির দুঃসহ বরফ/ আদিগন্ত জমে ওঠে নিত্য যার বুকে/ আর সেই সহ্যাতীত শীতে/ একান্ত চাদর ছাড়া বিকল্প পোশাক নেই কোনো।/ জন্মেই জেনেছি এই ধূলি-ধূসরিত/ প্রাচীন চাদর ছাড়া আর কোনো/ দ্বিতীয় পোশাক তার উমের আদর আমাকে দেবে না...’ (কবিতা সংগ্রহ-১ পৃষ্ঠা ১৫)

না, এই কবিতা আলোচনার জন্য নয়, ‘শীত’ আমার অস্তিত্বে কীভাবে মিশে আছে আর শীত আমি কীভাবে দেখি সেই মনোজাগতিক উপলব্ধির আলোকে শীত নিয়ে কিছু কথা লিখতেই প্রসঙ্গের অবতারণা।

ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে প্রতিটি ঋতুরই আলাদা সৌন্দর্য আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগে হেমন্ত, শরত্, বসন্ত। দক্ষিণ হাওয়ার উচ্ছ্বাসে পুষ্পিত বসন্ত যেন হঠাত্ নাড়িয়ে দেয় অস্তিত্বের মর্মমূল। শরত্ আর হেমন্তের মধ্যে মোটা দাগের পার্থক্য আমি দেখি না। একধরনের পেলব স্নিগ্ধতা, ফসলহীন হেমন্তের শূন্য মাঠ কবি জীবনানন্দ দাশের চেতনায় যতই দুঃখের জাল বুনে যাক না কেন—না শীত, না গরম এই ঋতু আমার বেশ লাগে। বিশেষ করে বর্ষার প্রবল বৃষ্টি শেষে শরত্ আসে অনেকটাই যেন লাজুক তরুণীর মতো মৃদুপায়ে, আসে হালকা কুয়াশার আমেজ নিয়ে। মাঠপ্রান্তর কাঁপিয়ে শুভ্রতার নান্দনিক একটা চিত্র এঁকে দেয় কাশফুল বাংলার সবুজ প্রকৃতির কোলে। হেমন্ত আসে শীতের আবাহনী গান গেয়ে প্রকৃতিকে নতুন করে সাজাতে, আসে শীতের সবজির আগাম সংবাদ নিয়ে। পাতাঝরা দিনের নিঃসঙ্গতার বিষাদ ছড়িয়ে। বাংলা কবিতায় শরত্-হেমন্তবন্দনা খুব কম হয়নি। জীবনানন্দ দাশ শুধু নন, তাঁর পূর্বসূরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো সংগীতে আর কাব্যে শারদবন্দনা করেছেন দেবী দুর্গার সমান্তরালে। বাংলা কবিতার বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে শরত্-হেমন্তের স্নিগ্ধ পেলব অনুভূতিরাশি।

তবে দুঃখের বিষয় এই যে, একালে আর ঋতুবৈচিত্র্য তেমন একটা চোখে পড়ে না। বিশেষ করে কাব্যে-সংগীতে আমরা যে ঋতুচিত্র দেখি আজকের বাংলাদেশে বাস্তবে সেই দৃশ্য নেই। কারণ আমাদের সবার জানা। আসলে আমরা যেন সবাই মিলে হত্যা করেছি আমাদের সবুজ-শ্যামল নিসর্গকে। নিরন্তর গাছ কেটে বসতি গড়ে চলেছি, বাগান-বনভূমি উজাড় করেছি। কিন্তু একটি গাছ কাটলে যে আরেকটি গাছ লাগানো উচিত সে সত্য আমরা বিস্মৃত হয়েছি। এখন কেউ দশটি গাছ কেটেও একটি গাছ লাগায় না। এর ওপর আছে কীটনাশকসহ নানারকম রাসয়নিক সন্ত্রাস—যা আমাদের সবুজ প্রান্তরকে বিরান করেছে। আর বিষাক্ত বর্জ্য তো আছেই। ফলে এখন আর বাংলাদেশের কোনো গ্রামে গেলে কেউ দিগন্তবিস্তৃত সবুজ দেখে মুগ্ধ হবার সুযোগ পাবেন না। অথচ মাত্র চার দশক আগেও মাইলের পর মাইল সবুজ ছিল। এমন কোনো বাড়ি ছিল না যে বাড়িতে রকমারি ফলের গাছ থাকত না। প্রতিটি বাড়িতে তাল-সুপারি, আম-কাঁঠাল-এর বাগান ছিল। বাড়িগুলোর চারদিক ঘিরে থাকত সীমানাপ্রাচীর সদৃশ নারকেল গাছের সারি। কোনো কোনো বাড়ির সীমানা চিহ্নিত হতো সারি-সারি তালগাছ দিয়ে।

আমার শৈশব-কৈশোরে দেখা সেই সবুজ ছবি আর কোথাও এখন নেই। এসব কারণে বাংলাদেশের ষড়ঋতু কথাটা এখন শুধু শিল্প-সাহিত্যেই বেঁচে আছে। এখন মোটা দাগে দৃশ্যমান ঋতু বলতে শুধু গ্রীষ্ম আর বর্ষার কথাই বলা যায়। শীত আসে শীতকাল পার করে, তাও মাত্র কিছুদিনের জন্য। কোনো কোনো বছর শীত কিংবা বর্ষায় শীত প্রায় পড়েই না, বৃষ্টিও তেমন হয় না। আসলে ঋতু হারিয়েছে তার স্বাভাবিক গতি। এসব কারণেই প্রকৃতিও হারিয়েছে তার স্বভাবিক আচরণ। বর্ষায় বৃষ্টির অভাবে কৃষক আর্তনাদ করে। আবার এমন হঠাত্ মুষলধারার বর্ষণ হয়ে যায়, যা কারো কল্পনাতেও আসে না। ফলে কৃষি ফসল নষ্ট হয়। শীতের অনিয়মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

প্রকৃতির এত বিপর্যয় সত্ত্বেও ঋতুবন্দনা এখনো আমাদের সাহিত্য থেকে হারিয়ে যায়নি। হেমন্ত, শীত, বর্ষা ইত্যাদি নানা ঋতু নিয়ে সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে বিশেষসংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রবীণ-নবীন সব কবিই ঋতু নিয়ে কবিতা লেখেন। তবে আমার ধারণা তরুণ কবিদের চেয়ে প্রবীণরা ঋতুবর্ণনার ক্ষেত্রে সুবিধাটা বেশি পান, কারণ তাঁদের স্মৃতিভাণ্ডারে ঋতুবৈচিত্র্যের অভাব নেই। ছেলেবেলার দিকে যখন তাকাই তখন মনে পড়ে শীত আর বর্ষার তুমুল তুখোড় দিনরাত্রি। বিশেষ করে এমন তীব্র শীত পড়ত, যাকে বলে হাড়কাঁপানো শীত। সেইসব শীতরাত্রিতে গ্রামের অনেক বাড়িতেই দেখেছি শোবার ঘরে মাটির পাত্রে কয়লার আগুন রেখে ঘুমাতে, যার দরুন ঘরময় কিছুটা ঊষ্ণতা ছড়াত! সত্যিই এ যেন আধুনিককালে হিটারের পূর্বসূরি। আবার শীতের সকালে দেখেছি বাড়ির উঠানে খড়বিচালি জ্বালিয়ে ছোটবড় সবাই মিলে আগুন পোহাতে। তখন কুয়াশা পড়ত খুব।

আগে গ্রামে অর্ধ সাপ্তাহিক হাট বসতো এবং সেই হাট চলত মধ্যরাত অবধি। তখন আব্বার হাত ধরে রাত ৯টা-১০টার দিকে যখন ফিরতাম তখন হারিকেন থাকলেও পাঁচ হাত দূরে কী আছে তাও দেখা যেত না ঘন কুয়াশায়। আর সে কী শীত! চাদরে মাথা মুড়িয়েও শীতে কাঁপতে হতো। পুকুরে হাতমুখ ধুতে গিয়েও অবশ হয়ে আসত হাত-পায়ের আঙুল। একালের মতো এত শীতবস্ত্রও ছিল না তখন। অধিকাংশ সচ্ছল মানুষ পরত চাদর, গরিবেরা কান-মাথা গামছা দিয়ে বেঁধে শীত নিবারণের চেষ্টা করত। পাকিস্তানি আমলে এ ভূখণ্ডে যে ভয়াল দারিদ্র্য ছিল তাতে এর বেশি শীতবস্ত্র সাধারণের আয়ত্তে ছিল না।

শীতে মানুষ কষ্ট পেয়েছে, এ কথা সত্য, তবে শীতের সৌন্দর্য তাতে এতটুকু ম্লান হয়নি। বিলের পর বিল হলুদ শর্ষে ফুল ফুটে থাকা কুয়াশাভেজা ছবি, আমন ধানের সোনালি থোকায় জমে থাকা শিশির, রোদের ঝিকিমিকি, অসংখ্য খেজুর গাছে ঝুলন্ত রসের হাঁড়ি, রাতের বেলা কিশোর-যুবারা চুরি করে রস পেড়ে দলবেঁধে ফিরনি-পায়েস রান্না করে পিকনিকের আমেজে ঝোপ-জঙ্গলে বসে খাওয়া, শীতের সিম, টমেটো, শিং-মাগুড়, কৈ মাছসহ রকমারি মাছ আর সবজির বাহার এখনো যেন লেগে আছে চোখে।  এখন গ্রামবাংলা আধুনিক নগরসভ্যতার অনেক সুবিধা পেয়ে গেছে এই কথা ঠিক, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছে অনেক ঐতিহ্য, অনেক আনন্দের উপকরণ। দাঁড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, কাবাডি, কুস্তিসহ কতরকমের লোকজ খেলাধুলা যে শীত মৌসুমে হতো তার ইয়ত্তা নেই।