আশুগঞ্জে বন্ধ তিন শতাধিক চালকল !

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪৪

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু নাসের বলেন, ‘এখন মৌসুমের শেষ। কৃষকের কাছে ধান কম আছে। সে কারণে বাজারে সরবরাহ কম। তবে নতুন ধান বাজারে আসতে শুরু করেছে। সপ্তাহ দুইয়েকের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

সেলিম পারভেজ, আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা

বাজারে ধানের তীব্র সংকট ও ধানের বাজারের সঙ্গে চালের বাজারের সামঞ্জস্য না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো ধান-চালের পাইকারি মোকাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার ৩ শতাধিক চালকল। লোকসানের আশঙ্কায় বন্ধের পথে রয়েছে আরো শতাধিক। আর এতে বেকার হয়ে পড়েছে ১০ হাজারেরও বেশি চাতাল শ্রমিক। অগ্রিম শ্রম বিক্রি করে মালিকের কাছ থেকে দাদন নিয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন এসব চাতালের শ্রমিকরা। তবে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে নতুন ধান এলে এসব চাতাল সচল হয়ে উঠার পাশাপাশি চাতাল শ্রমিকদের মাঝেও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে ধারণা করছেন চাতাল মালিকরা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওর অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ ধান বিক্রি করতে আশুগঞ্জ মোকামে নিয়ে আসে কৃষকরা। আর এসব ধান উপজেলার ৪ শতাধিক চাতাল পক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরিত করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে।

যেখানে প্রতিদিন এই মোকামে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মণ ধান বেচাকেনা হতো সেখানে বর্তমানে বাজারে ৪ থেকে ৫ হাজার মনের বেশি ধান আসছে না। এছাড়া বাজারে বর্তমানে ধানের দাম বেশি হওয়ায় এসব ধান কিনে চালে রূপান্তর করে তেমন একটা লাভবান হওয়া যাচ্ছে না।

মোকামে ধান নিয়ে আসা পাইকার ও কৃষকরা জানান, বছরের শেষ সময়, এ কারণে ধানের সরবরাহ কম। তবে নতুন ধান উঠলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে। বাজারে ধানের দাম কমে গেলে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়তে পারে।

চাতালকল মালিক শাকিল আহমেদ ও মিজান মিয়া জানান, বছরের বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত ১২ মাস চলে চাতালের ব্যবসা। প্রতিবছরের শেষ দিকে ধানের সংকট দেখা দেয়; কিন্তু এ বছর সংকট বেশি হওয়ায় এমনিতেই লোকসান গুণতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে মিল বন্ধ করতে হচ্ছে।  

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ উপজেলা চাতালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. শাহজাহান সিরাজ জানান, ধান সংকটের কারণে ইতোমধ্যে অধিকাংশ চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলো বন্ধের পথে। সব ব্যবসায়ীই এখন লোকসানের মুখে। তাছাড়া চাতালকলের শ্রমিকরা বেকার হয়ে কষ্টে দিন পার করছে। তবে বাজারে নতুন ধান এলে চাতালগুলো সচল হয়ে যাবে। এছাড়া ধানের দামের সঙ্গে চালের দামের সমন্বয় হলে ব্যবসায়ীরাও লোকসানের হাত থেকে বাঁচবে। 

জেলা চাতালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. উবায়দুল্লাহ জানান, যেখানে প্রতিদিন এই মোকামে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মণ ধান বেচাকেনা হতো সেখানে বর্তমানে বাজারে ৪ থেকে ৫ হাজার মণের বেশি ধান আসছে না। এছাড়া বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান ৮শ টাকারও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব ধান কিনে চালে রূপান্তর করে তেমন লাভবান হওয়া যাবে না।

এদিকে বন্ধ এসব চাতালকলে কর্মরত শ্রমিকরা কাজ না থাকায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। শ্রমিকরা কাক ডাকা ভোর থেকে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ধান থেকে চাল উত্পাদন করে থাকেন; কিন্তু বছরের শেষ সময়ে ধান সংকটের কারণে চাতাল মালিকগণ চাতালগুলো বন্ধ করে দেয়। এতে করে চাতাল শ্রমিকরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খুব কষ্টে আছেন।

চাতালকলের শ্রমিক ফাতেমা বেগম জানান, ‘ধানের অভাবে মিল মালিক মিল বন্ধ করে দিছে, এখন আমাদের দিন চলছে খুবই কষ্টে, মালিকের কাছ থেকে খুচরা টাকা নিয়ে কোনোরকম দিন কাটছে।’  চাতাল শ্রমিক তৌহিদ মিয়া জানান, ‘আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি। এক বেলা খেতে পারলে আরেক বেলা খেতে পারি না। মালিকের কাছ থেকে ধার নিয়ে কোনো রকমে বউ-বাচ্চা নিয়ে টিকে আছি।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু নাসের জানান, এখন মৌসুমের শেষ। কৃষকের কাছে ধান কম আছে। সে কারণে বাজারে সরবরাহ কম। তবে নতুন ধান বাজারে আসতে শুরু করেছে। সপ্তাহ দুইয়েকের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।