বছরে ক্যান্সার আক্রান্ত তিন লাখ, মৃত্যু ২ লাখ

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:৫৬

দেশে প্রতিবছর নানা ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ৩ লাখ মানুষ। অপর্যাপ্ত চিকিত্সা ব্যবস্থা আর অসচেতনতার কারণে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বছরে ৬৬ শতাংশ (প্রায় ২ লাখ) মারা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি মিলিয়ন (১০ লাখ) মানুষের জন্যে ১টি ক্যান্সার চিকিত্সা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। সেই হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ১৬০টি ক্যান্সার চিকিত্সা কেন্দ  থাকা জরুরি। অথচ রয়েছে মাত্র ১৮টি। এগুলোর মধ্যে সমন্বিত ক্যান্সার চিকিত্সা কেন্দ  মাত্র একটি। অধিকাংশ কেন্দে  নেই রেডিওথেরাপি মেশিন। অপরদিকে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্যে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক রয়েছেন মাত্র ১৫০ জন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সার চিকিত্সা কেবল ঢাকাকেন্দি ক না রেখে বিকেন্দ ীকরণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দিয়ে গরিব রোগীদের চিকিত্সা সুযোগ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো অলাভজনক মনোভাব নিয়ে ধনীদের এই চিকিত্সা সেবায় বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তারা বলেন, ক্যান্সারের শুধু চিকিত্সা দিলেই চলবে না, ক্যান্সার প্রতিরোধে যে তথ্য উপাত্ত আছে, তা জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে।

জানা গেছে, ঢাকার মহাখালীতে ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি ক্যান্সার হাসপাতাল হিসেবে চিকিত্সাসেবা দিচ্ছে। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ৮টি প্রতিষ্ঠানে এখন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা হলেও নেই প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপির আধুনিক যন্ত্রপাতি।

‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) ও বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এসব রোগীর মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর, রক্তনালি, জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি। মহিলা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ জরায়ু-মুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত।

বিশেষজ্ঞরা জানান, খাদ্যে বিষক্রিয়া, পরিবেশ বিপর্যয়, তামাকজাত দ্রব্য সেবন, প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশের অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষের শরীরে অস্বাভাবিক কোষ দিনে দিনে বাড়ছে। এ থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকছে। ফলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ২ কোটি ১৪ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্তের ঝুঁকিতে আছে। জাপানের ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র (জেজেসিও) প্রতিবেদনসহ দেশি ও বিদেশি নানা গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিত্সক সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় নয়। সরকারি ১৫টি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি মেশিনসহ প্রশিক্ষিত লোকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। আর ক্যান্সার চিকিত্সায় যেসব জনবল তৈরি হচ্ছে তারা শহরমুখী, বাণিজ্যিক মানসিকতাসম্পন্ন। সেবা এবং গবেষণা কাজে তাদের আগ্রহ নাই।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকী বলেন, দেশে ক্যান্সার চিকিত্সার অবস্থা ভয়াবহ। এখানে ক্যান্সারের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক আছে ১৫০ জনের মতো। তা ছাড়া ক্যান্সার চিকিত্সা নির্ণয়ের জন্য নেই পর্যাপ্ত আধুনিক ব্যবস্থা। অথচ রোগ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেলে প্রায় ৫০ ভাগ রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্ল­াহ তালুকদার রাসকিন বলেন, গত আড়াই যুগে আধুনিক প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ওষুধ বাংলাদেশে আসছে। সরকার এ সব ব্যাপারে যথেষ্ট এগিয়ে রয়েছে। বেসরকারি কিছু হসপিটালও এগিয়ে এসেছে ক্যান্সার চিকিত্সায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখন পর্যন্ত ক্যান্সার চিকিত্সায় সমন্বিত ক্যান্সার সেন্টার দেশে একটাই, সেটা জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট। যার কারণে সারাদেশের ক্যান্সার রোগীর চাপ ঢাকাকেন্দি ক। রেডিওথেরাপির জন্য সেখানে ৪/৫ মাস; কেমোথেরাপির জন্য ২/৩ সপ্তাহ এবং সার্জারির জন্য ১/২ মাস অপেক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি সামর্থ্যের বাইরে রোগী দেখতে গিয়ে স্পেশালাইজস্ট ইনস্টিটিউট হিসেবে সেবার মান ধরে রাখা যাচ্ছে না। ক্যান্সার ইনস্টিটিউট মূলত গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রোগীর অত্যধিক চাপ সামলাতে গিয়ে জনবল তৈরি, শিক্ষা, প্রতিরোধ এসব বিষয় পেছনে পড়ে গেছে।

ইত্তেফাক/নূহু