নেত্রকোনার খালিয়াজুরী সদর সংলগ্ন ফসল রক্ষা বাঁধ কীর্তনখোলা। চলতি অর্থ বছরে ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দকৃত এ বাঁধের উদ্বোধন হয়েছিল ১ মাস আগে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় এ বাঁধ মেরামত কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবার কথা থাকলেও এখনো নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রয়েছে ৯৫ ভাগ। নির্দিষ্ট সময়ে এ বাঁধ হলে বন্যার কবল থেকে বাঁচবে হাওরের হাজার হাজার হেক্টর ফসল। অথচ, শুধুমাত্র নিজেদের লাভের আশায় এ বাঁধের কাজ না করে সময় পার করছে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)।
বাঁধ নির্মাণ কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সরকার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বাবু 'উপজেলা প্রশাসন খালিয়াজুরী নেত্রকোনা' নামের ফেসবুক আইডিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি লিখেছেন- 'কীর্তনখোলা বেড়ি বাঁধ নিয়ে পিআইসি সভাপতি সদর ইউনিয়নের ইউপি মেম্বার অজিত ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে। গত ১০/১/১৮ তারিখে কীর্তনখোলা বেড়িবাঁধে তার অংশ আমি নিজে উদ্বোধন করি। কাল এক মাস পর গিয়ে দেখি নামকা ওয়াস্তে কিছু মাটি ফেলে একটা ভাঙা অংশ বন্ধ করেছে। মাত্র ৫ ভাগ কাজ করেছে।'
এব্যাপারে পিআইসি সভাপতি অজিত সরকার বলেন, 'প্রকল্পের অর্থ হাতে পেয়েছি বিলম্বে তথা ৪ ফেব্রুয়ারি। দেরিতে টাকা পাওয়ায় কাজে বিঘ্ন ঘটেছে।' এ মুহুর্তে হাওরে ফসল রক্ষার অন্যান্য বাঁধ নির্মাণ কাজ নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'উপজেলায় শুধুমাত্র কীর্তনখোলা বাঁধ নয় চাকুয়া ইউনিয়নের বাগানবাড়ি ও রানিচাপুরের পাশে দুটি নদীর বাঁধসহ বেশ কয়েকটি বাঁধের কাজের গতি খুবই কম। যথা সময়ে বাঁধ নির্মাণ না হবার সম্ভাবনাই বেশি। এতে গত বছরের মতো এবারো হয়ত আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ফসলের শেষ রক্ষা হবে না। এখানকার কাজে রয়েছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা।'
খালিয়াজুরী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পাউবো'র উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য গোলাম কিবরিয়া জব্বার জানান, খালিয়াজুরীর ইউএনও ও কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি শুধুমাত্র ইউপি চেয়ারম্যানদের গুরুত্ব দিয়ে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে এখাকানকার অধিকাংশ পিআইসি করেছেন। নীতিমালায় রয়েছে বাঁধ সংশ্লিষ্ট হাওরের প্রকৃত কৃষকদের নিয়ে গঠন করতে হবে পিআইসি। এ নিয়ম না মেনে প্রায় ১১ কোটি টাকার কাজে উপজেলায় ৪৫টি পিআইসির প্রায় সবকটাতেই সভাপতি রাখা হয়েছে ইউপি'র চেয়ারম্যান-মেম্বারদের। আর সদস্য করা হয়েছে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বাড়ির কামলা-কাজলাদের (শ্রমিকদের)।' তিনি বলেন, 'এ ধরণের পকেট কমিটিতে বাঁধের কাজ না হয়ে টাকা লুটপাট হবার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিগত বছরগুলোর পকেট কমিটিতে কাজ না হয়ে অর্থ লুটপাটই বেশি হয়েছে।' তিনি আরো বলেন, 'অনেক বাঁধে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত টাকা। আবার প্রয়োজনীয় অনেক স্থানকে রাখা হয়েছে প্রকল্প আওতার বাইরে।'
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন চক্রবর্তী বলেন, 'এখানে গত বছরের ফসল মার খাওয়া মানুষের ফসল এবার যেন মার না যায় এবং এলাকার প্রত্যেক শ্রমিক প্রতিদিন বাঁধ মেরামত কাজের বিনিময়ে যেন কমপক্ষে পাঁচশ' টাকা পায় সে উদ্দেশ্যে সরকার বাস্তবায়ন করছে হাওরে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প। অথচ, সরকারের মহৎ এ উদ্দেশ্যটি প্রায় ভেস্তে যাচ্ছে। উপজেলার প্রকল্পসমূহে সিংহ ভাগ কাজ হচ্ছে নিয়মের বাইরে ভ্যাকু মেশিন দিয়ে। এতে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছে কাজের বিনিময়ে টাকা থেকে। অন্যদিকে, ওই মেশিন দিয়ে বাঁধের একেবারে নিকটবর্তী স্থান থেকে (৮/১০ ফুটের মধ্যে) গর্ত করে মাটি তুলে বাঁধ মেরামত করায় বাঁধে গোঁড়া খুবই দুর্বল হচ্ছে। এতে সামান্য পানির ধাক্কাই বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাবে।'
এদিকে, পিআইসি গঠনের বিষয়ে ইউএনও সরকার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বাবু বলেন, '৩০ নভেম্বর এখানে যোগদানের দিনেই আমাকে স্বাক্ষর করতে হয়েছে পিআইসি কমিটি অনুমোদনে। বাঁধের কাজকে তরান্বিত করতেই তেমন যাচাই-বাছাই না করে খুব দ্রুত পিআইসি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি, অভিযোগের প্রেক্ষিতে কয়েকটি পিআইসি’র সভাপতি ও সদস্যদের বাতিল করে অন্যদের নিয়োগ করা হয়েছে।'
কাজের সার্বিক বিষয়ে নেত্রকোনা পাউবো'র নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান জানান, 'দৈব চয়ন পদ্ধতিতে বাঁধের মাটি পরিমাপ করে চূড়ান্ত বিল দেয়া হবে। তাই কোন বাঁধে অতিরিক্ত টাকা দেয়ার কোন সুযোগ নেই। খালিযাজুরীতে এবার প্রায় আড়াইশ' কিলোমিটার বাঁধ মেরামত হচ্ছে। এর পরও কোথায়ও যদি মেরামতের প্রয়োজন পরে তবে তা বিবেচনা করা হবে। এদিকে, শ্রমিক দিয়ে মাটি কেটে সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে না। তাই ভ্যাকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার জন্য। তবে নিয়ম অনুযায়ী বাঁধের ১শ' ফুট দূর থেকেই মাটি কাটা হচ্ছে। এখানে ৪৫টি প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে প্রায় ১১ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়নে কোন রকম দুর্নীতি নেই।
ইত্তেফাক/এসএস
