সিংড়ায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর মিথ্যা অভিযোগ, নেপথ্যে কোচিং বাণিজ্য

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:৫৩

নাটোরের সিংড়ায় বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের গণিত বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে এসেছে অন্তরালের খবর। একজন সিনিয়র, ভালো, দক্ষ শিক্ষককে বলির পাঠা বানানোর জন্য কয়েকটি মহলের ষড়যন্ত্র প্রকাশ পেয়েছে। 

জানা যায়, গত ১১ এপ্রিল বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের গণিত বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক ফজলার রহমানের বিরুদ্ধে নবম শ্রেণির ১৩জন শিক্ষার্থী ও ১১জন অভিভাবক স্বাক্ষরিত একটি  অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর দেওয়া হয়। এতে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হয়। এ নিয়ে দু-একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার ভূমিকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে অনুসন্ধানে স্কুলের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে বেড়িয়ে এসেছে ঘটনার পেছনের আসল তথ্য। জানা গেছে, ২০০৬ বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠানটি উপজেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী প্রায় ৮০০। অভিযুক্ত ফজলুর রহমান ২০০৯ সালে অত্র প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি যোগদানের পর স্কুলের নিয়ম শৃংখলা, পড়ার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলগামী করার দিকে নজর দেন।

সম্প্রতি সিংড়া পৌরসভার মাদরাসা মোড় এলাকায় গড়ে উঠেছে দ্বিমিক কোচিং সেন্টার। সরকারিভাবে কোচিং বন্ধের নির্দেশনা থাকলেও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। পৌরসভার বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই কোচিং সেন্টারে পড়াশোনা করে। কোচিং সেন্টারের পরিচালক মারুফ ওলি তিলকের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক এটি পরিচালনা করে আসছে। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ এই কোচিং সেন্টারে প্রাইভেট পড়ে। ক্লাস চলাকালে বিয়াম স্কুলের সেই শিক্ষার্থীরা এই কোচিংয়ে পড়ে এমন অভিযোগও রয়েছে। 

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের খসড়া এখানকার পরিচালকের পরামর্শে করা হয়। তিনি নিজের কোচিং সেন্টারের স্বার্থে একজন স্বনামধন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ লিখে দেন। এখানেই অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। বিয়ামের পাশে অবস্থিত রেনেসাঁ অক্সফোর্ড কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের অধ্যক্ষ সাংবাদিক সাইফুলের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে সংবাদটি রং মাখিয়ে প্রকাশ করা হয়। একজন ভালো শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছিত করায় ক্ষোভ বিরাজ করছে অভিভাবক মহলে।

শনিবার সরেজমিনে পৌর এলাকার মাদরাসা মোড়ে ওই দ্বিমিক কোচিং সেন্টারে গিয়ে বিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়তে দেখা যায়। এ সময় কোচিংয়ের পরিচালক তিলককে কয়েকটি প্রশ্ন করা হলে তিনি তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। উপরন্তু সাংবাদিকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।

বিয়াম ল্যাবরেটরী স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার বিয়াম স্কুলে ক্লাস চলাকালে সহকারী কমিশনার ভূমি বিষয়টির তদন্তে গেলে সেখানে ওই কোচিং সেন্টারের পরিচালক তিলক বিয়ামে উপস্থিত হয়ে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের ডেকে নেন। শিক্ষক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু তিনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকও নন, আবার কোন শিক্ষার্থীর অভিভাবকও নন।

শিক্ষার্থীরা আরো জানায়, দীর্ঘদিন থেকে দ্বিমিক কোচিং সেন্টারের পরিচালক তিলক তার কোচিং সেন্টারে পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ (টাকা দিতে হবে না, তোমরা পড়ে এসো) করে আসছে। তার কোচিং সেন্টারে পড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। তাদের টার্গেট বিয়ামের স্বনামধন্য শিক্ষকদের ওপর। কারণ বিয়ামের মান ক্ষুন্ন হলে শিক্ষকদের কাছে না পড়ে একদিকে কোচিংয়ে আকৃষ্ট হবে অপরদিকে পাশে রেনেসাঁর দিকে ঝুঁকবে শিক্ষার্থীরা।

আলাপকালে কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, ফজলুর রহমান একজন ভালো মানের শিক্ষক, তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ কেউ দেয়নি। অভিযোগ প্রদানকারী কয়েক শিক্ষার্থীর চলাফেরা আপত্তিকর ছিলো। এ বিষয়ে অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগও দেওয়া আছে। তবে হঠাৎ করে শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ এমন অভিযোগগুলো তাদের কাছে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তারা বলেন, মূলত কোচিং বাণিজ্য এবং পার্শ্বে অবস্থিত একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ পাথরঘাটায় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ধর্ষণে থানায় মামলা

অভিযুক্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান জানান, ‘গত ৬ এপ্রিল স্কুলের নবম শ্রেণির ক্লাস পরীক্ষা শুরুর সময় কিছু শিক্ষার্থীর আচরণ দৃষ্টিগোচর হয়। এক সাইডের ৭টি বেঞ্চ পরিপূর্ণ অন্য সাইডে দুটি বেঞ্চ পরিপূর্ণ ছিলো। আমি শুধু পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য পিছনের দুই বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের অপর সাইডে আসতে বলি। কিন্তু তারা না এসে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। পরে পাশের রুমের দায়িত্বরত ম্যাডামকে ডেকে নিয়ে আসি। ম্যাডাম তাদের অনুরোধ করলে তারা বসে। কিন্তু ১০ মিনিট পর সাদা খাতা জমা দিয়ে চলে যেতে চায়। এটি পরীক্ষার নীতি বহির্ভূত বলে তাদের বারণ করলেও তারা আমার কথায় কর্ণপাত করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর বেশি কিছু ঘটেনি। পরে শুনলাম ওই শিক্ষার্থীরাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে হলুদ সাংবাদিকতা করা হয়েছে।’ তিনি বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

দ্বিমিক কোচিং সেন্টারের পরিচালক মারুফ ওলি তিলকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে পরে কথা বলবো।’

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আজিজুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’

রেনেসা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অধ্যক্ষ ও দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সিংড়া প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ ছাপানো হয়েছে। তবে অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির কোন প্রমাণ আমার কাছে নেই।’

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিপুল কুমার জানান, ‘এ বিষয়ে গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করি এ ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে।’

আরও পড়ুনঃ ঝালকাঠিতে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা

উপজেলা নিবার্হী অফিসার সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, ‘সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) কঠোরভাবে বলা আছে। তদন্ত শেষে দোষীর/দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ইত্তেফাক/নূহু