মশার উপদ্রব, আবর্জনা ভাঙা সড়কে দুর্ভোগ

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৮, ০৯:৫০

দিন যতই যাচ্ছে, প্রকট হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নাগরিক সমস্যা। পুরানো সমস্যার সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন সমস্যা। ফলে চারশ’ বছর ঐতিহ্যের শহর ঢাকা দক্ষিণের নাগরিক দুর্ভোগ বেড়েই চলছে। সমপ্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, বসবাসের অনুপযোগীর দিক দিয়ে বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। ওইসব শহরের মধ্যে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য চতুর্থ শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

স্মার্ট ঢাকা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করলেও নানা সমস্যার মুখে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ পার করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। মশার উপদ্রব, বছরজুড়েই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন অপরিষ্কার, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা, উন্নয়ন কাজে ধীরগতি, সেবাখাতগুলোতে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব, দক্ষ জনবলের অভাব, সেবা পেতে হয়রানি—এমন সব নানা সমস্যায় ডুবে আছে ডিএসসিসি।

কর্তৃপক্ষ বলছে, সেবায় তাদের কোনো ত্রুটি নেই। তবে সঠিক জনবল ও সরঞ্জামের অভাব, আয় কম ব্যয় বেশি এবং নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে নাগরিক সুবিধা দিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নেই পর্যাপ্ত জনবল। নিয়োগবিধি চূড়ান্ত না হওয়ায় নতুন জনবল নিয়োগ দিতে পারছে না ডিএসসিসি। আইনের ফাঁদে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে আছে মন্ত্রণালয়ে। আবার সংস্থাটির যে জনবল  আছে তাদের অনেকে কর্মে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আছে। কাজ না করেই ডিএসসিসি’র ৩০ ভাগ পরিচ্ছন্ন কর্মী বেতন তোলে। খোদ ডিএসসিসির মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কাজ না করেই এই পরিচ্ছন্ন কর্মীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু ফাঁকিবাজ কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। আবার কর্মে ফাঁকি এড়াতে মেয়র ডিজিটাল এটেন্ডেন্স-এর ব্যবস্থা করলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেদিকে আগ্রহ কম বলে জানা গেছে।

সংস্থাটির ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে একজন করে পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক রয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে আয়তন ভেদে ১০০ থেকে ১৫০ জনের মতো পরিচ্ছন্ন কর্মী থাকেন। তাদের মধ্যে মাঠে থাকেন না এক-তৃতীয়াংশ কর্মী। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় বেশ কয়েকবার ধরা পড়েছে বিষয়টি। এ বিষয়ে সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে এমন তথ্য দেখালেও এটা আসলে সঠিক না। এক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি আছে। সেটা সংশোধন করা হচ্ছে। দেখা যায়, পরিচ্ছন্ন কর্মীদের মোবাইলের সঠিক ব্যবহার না করতে পারায় এ রকম তথ্য উঠে এসেছে। যদি পরিচ্ছন্ন কর্মীরা কাজ না করে টাকা তুলতো, তাহলে তাদের দায়িত্বরত এলাকাগুলো অপরিষ্কার  থাকতো। সকালে ঘুরলে দেখতে পাবেন সব জায়গা পরিষ্কার। তবে একটা সমস্যা হলো, পরিষ্কার জায়গাগুলোই নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে সকাল দশটায় অপরিষ্কার হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে সংস্থাটির রাজস্ব আয় কম। তবে ব্যয় বেশি। সংস্থাটির দাবি, ভৌগোলিক সীমারেখার উপর ভিত্তি করে বিভাজনের ফলে অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের আয়ের মাত্র ৩৫ ভাগ পায় ডিএসসি, ৬৫ ভাগ পায় ডিএনসিসি। বিপরীতে ডিএসসিসি’র ব্যয় ৬৫ ভাগ আর ডিএনসিসি’র ব্যয় ৩৫ ভাগ।

ডিএসসিসি এলাকার বড় সমস্যা হচ্ছে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় দৈনিক আবর্জনা উত্পন্ন হয় প্রায় তিন হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে প্রতিদিন অপসারণ করা হচ্ছে এক হাজার ৯০০ টন। বাকি এক হাজার ৬০০ টন আবর্জনা যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। এসব আবর্জনায় ডিএসসিসি এলাকার বিভিন্ন ডোবা-নালা ও নদী-খাল ভরাট হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব আবর্জনা ডিএসসিসি এলাকার পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।

অন্যদিকে শীত যেতে না যেতেই জেঁকে বসেছে মশা। বাসা-অফিস থেকে শুরু করে রাজধানীর সর্বত্র মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ এখন নগরবাসী। এমনকি মশার কারণে বিমানের একটি ফ্লাইটও সম্প্রতি দুই ঘণ্টা দেরি করে ছাড়তে হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল ইত্তেফাককে বলেন, মশা নিধন একটা মাঠ পর্যায়ের কাজ। এ কাজটি ঘরে বসে করার সুযোগ নেই। আমাদের কার্যক্রম আগের চেয়ে বেড়েছে। আমাদের ৩০০ কর্মী মাঠে কাজ করে। সবাই যে সঠিকভাবে কাজ করে সেটা বলতে পারব না। তবে আমরা একটা কনট্রোল রুম করতে যাচ্ছি যেখান থেকে তাদের তদারকি করা হবে।

জানা গেছে, নানা কারণে ফুটপাতও উচ্ছেদ করতে পারছে না ডিএসসিসি। ফুটপাত উচ্ছেদের জন্য ২৬ জন স্বেচ্ছাসেবী থাকলেও তাদের কেউ তোয়াক্কা করে না। একদিকে অভিযান চলে, অন্যদিকে ফুটপাত বসে। অভিযোগ আছে, সিটি করপোরেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার কাজের পরিবর্তে হকারদের বসতে সাহায্য করে। সংস্থাটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ফুটপাত উচ্ছেদে ব্যর্থতা মনে করি না। কারণ এটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা একদিকে হকার উঠিয়ে দিচ্ছি আবার কিছুদিন পরে তারা বসে। আমাদের পাঁচজন নির্বাহী কর্মকর্তা পাঁচটি জোন ভাগ করে রুটিন করে উচ্ছেদ অভিযান করছে।

ইত্তেফাক/নূহু