বাড়ছে অস্ত্রের মজুদ কথায় কথায় গুলি

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:২৫


রাজধানীর মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ বাড়ছে। এখন কথায় কথায় গুলি চালায় তারা। সম্প্রতি অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযানেও খানিকটা ভাটা পড়েছে। সেই সুযোগটাই নিচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। সর্বশেষ রামপুরায় দুই গ্রুপ মাদক ব্যবসায়ীর সংঘাতের মধ্যে পড়ে দুই শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গত ৩ বছরে মাদক ব্যবসায়ীদের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি পথচারী ও প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী। নিহত হয়েছেন ৪ জন। গত বছরের ১৪ জুলাই রাতে রামপুরার মহানগর প্রজেক্টে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মাসুদ পারভেজ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর কাওরানবাজার থেকে গত শুক্রবার বিকালে মাদকের একটি চালান রমনা-রামপুরা থানার সীমান্তবর্তী বাগিচারটেক বালুর মাঠে পৌঁছে। মাদক ব্যবসায়ী রাশিদা ও মনির মাদক স্পটের অদূরেই ওই চালানটি নামানো হয়। এ সময় রাশিদার সঙ্গে চালান নিয়ে যাওয়া হিমেলের কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে হট্টগোল বেধে যায়। হিমেল ফোন করে ডেকে আনে তার বড় ভাইদের। এরা বিদেশে পালিয়ে থাকা রামপুরার শীর্ষ সন্ত্রাসী স্বপনের ক্যাডার। রাশিদাও ডাকেন তার অনুসারীদের। এরা কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্লা পলাশের ক্যাডার। এক পর্যায়ে দুই গ্রুপের গোলাগুলি শুরু হয়।

এই হামলার মধ্যে পড়ে শিশু আবদুল মালেক, কিশোর সোহেল ও ব্যবসায়ী গোলাম রাব্বানি গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। গুলিবিদ্ধ মালেকের হতদরিদ্র মা-বাবা ধারকর্জ করে ছেলের প্রাথমিক চিকিত্সা দিতে পারলেও ছেলের ভবিষ্যত্ চিকিত্সার চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছেন। কিশোর সোহেলের পরিবারের অবস্থাও একই। তারা চিকিত্সা নিয়ে সংকটে আছেন।

জানা গেছে, রামপুরা এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের যুদ্ধে ওই দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে গত শুক্রবারই শুধু ৩ পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়নি। গত ৩ বছরে তাদের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি পথচারী ও প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী। নিহত হয়েছেন ৪ জন। গত বছরের ১৪ জুলাই রাতে রামপুরার মহানগর প্রজেক্টে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মাসুদ পারভেজ। তিনি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে এলাকায় থাকা দায় হয়ে পড়েছে। এদের ব্যাপারে শক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করেন।

রমনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী মাঈনুল ইসলাম জানিয়েছেন, কে বা কারা গুলি করেছে সে বিষয়ে এলাকার কেউ কিছু বলতে পারছে না। সবাই শুধু বলছে, তারা গুলির শব্দ শুনেছে এবং কয়েকজনকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেছে। কিন্তু কে কাকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া যায়নি। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী কেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে অবৈধ অস্ত্রের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এখন কথায় কথায় তারা গুলি করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে নির্বাচন এখনই অবৈধ অস্ত্রের লাগাম টানা না হলে নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান। প্রতিনিয়তই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। এই অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলেও জানান তারা।

এদিকে ঢামেক হাসপাতালের ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডের ৩/বি-১ নম্বর বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে ৭ বছরের শিশু আবদুল মালেক। পাশেই বসে আছেন তার মা গার্মেন্টস কর্মী ফাতেমা বেগম। ছেলের এই পরিণতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, টাকার অভাবে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরিপুরের দাদা-দাদির কাছে মালেককে রেখে ছিলেন তারা। তার স্বামী চান মিয়া রিকশা চালক। অসুস্থ থাকায় ১৫ দিন ধরে কাজে যেতে পারেননি তিনি। গার্মেন্টসের যে সাড়ে ৬ হাজার টাকা তিনি বেতন পান তা থেকে ঘর ভাড়াই দিতে হতো ৩ হাজার। কুলোতে না পারায় রোজার আগেই তাদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মালেকের এই পরিণতিতে কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না ফাতেমা বেগম। ঘরে গচ্ছিত ১৫০০ টাকা ছিল। সেটা ঘটনার পর পরই শেষ হয়ে গেছে। হাজার পাঁচেক টাকা চান মিয়া ধারকর্জ করেছেন। তাও শেষ। এখন ছেলের ভবিষ্যত্ চিন্তায় অন্ধকার দেখছেন তিনি।

ইত্তেফাক/নূহু