বরিশালের সব জেলায় বাস ধর্মঘট, দুর্ভোগ চরমে

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ২০:১২
অবৈধভাবে বাস থেকে চাঁদা উত্তোলন, বরিশাল মালিক সমিতির বাস ঝালকাঠী, পিরোজপুর, বাগেরহাট এবং খুলনাসহ পশ্চিমাঞ্চলে চলাচল করতে না দেয়ার প্রতিবাদে বুধবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস ধর্মঘট শুরু করেছে বিভাগীয় সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ। এর আগে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে বৈঠক শেষে সংগঠনের নেতারা এ ধর্মঘটের ডাক দেন। বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি এবং বরিশাল বিভাগীয় বাস মালিক ও শ্রমিক সমন্বয় ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক শাহিন জানান, বরিশাল বিভাগের বেশ কয়েকটি মহাসড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কে একাধিক সংগঠনের নামে দীর্ঘদিন থেকে প্রকাশ্যে বাস থেকে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে বিভিন্ন সময় এর প্রতিকার চেয়েও কোনো সমাধান মেলেনি। এভাবে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির ফলে বাস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাই চাঁদাবাজি বন্ধে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, বরিশাল বিভাগে চলাচলরত দুরপাল্লার বাসগুলো এ ধর্মঘটের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বুধবার সকালে ধর্মঘটের পক্ষে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন থেকে ঝালকাঠি বাস মালিক সমিতি তাদের দাবির প্রেক্ষিতে বরিশাল থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটে কোন বাস চলাচল করতে দিচ্ছেনা। বরং তারা বেআইনি, অযৌক্তিক এবং সড়ক আইন ও মোটরযান আইন অধ্যাদেশের রুটপারমিটের শর্ত ভঙ্গ করে বরিশাল নগরীর অংশ পার হয়ে হাইওয়ে রাস্তার পাশে অননুমোদিত বাস টার্মিনাল তৈরি করে এককভাবে গাড়ি চালনা করছে।
 
বিভাগীয় বাস মালিক ও শ্রমিক সমন্বয় ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক কাওছার হোসেন শিপন জানান, ঝালকাঠী বাস মালিক সমিতির স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়াও পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জ উপজেলাধীন চান্দুখালীস্থানে কতিপয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা বাস থেকে চাঁদা আদায় ও যাত্রী হয়রানীসহ বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা মালিক সমিতির গাড়ি প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা। ফলে একদিকে যেমন যাত্রী দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে, তেমনি বাস শ্রমিকদের আয় রোজগার বন্ধ রয়েছে। লোকসানের সম্মুখিন হচ্ছে বরিশালের বাস মালিকরা। তাই বাধ্য হয়ে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাসহ বিভাগের সবকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।
 
বরিশাল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. সুলতান মাহমুদ জানান, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না নেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস ধর্মঘটের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। ঝালকাঠি জেলা বাস মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার আট কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। তা ব্যবহার করে বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা বাস মালিক সমিতি তাদের বাস চালিয়ে আসছে। কিন্তু সে রুটে ঝালকাঠি বাস মালিক সমিতি বাস চালানোর দাবি জানালেও সে রুটে আমাদের বাস চালাতে দেয়া হচ্ছেনা। 
 
তিনি আরও জানান, ঝালকাঠি জেলার বিশাল সড়ক ব্যবহার করে বরিশাল-খুলনাসহ ১০টি রুটে বাস চালাচ্ছে বরিশাল মালিক সমিতি। সেখানে আমাদের বাস চলতে দেয়া হচ্ছেনা। তাই আমাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কালিজিরা ব্রিজের পশ্চিমপাড়ে এবং দপদপিয়া ব্রিজের জিরো পয়েন্টে আরেকটি বাস টার্মিনাল করার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
 
এদিকে দু’পক্ষের রেষারেষিতে সাধারন মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এ রুটে যাতায়াতকারী যাত্রীরা জানান, বার বার এভাবে ধর্মঘটে তারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সকাল থেকে ধর্মঘটের কবলে রয়েছেন। বাস ছাড়া বিকল্প পথে ঝুঁকি নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপার উদ্দেশ্যে অবৈধ ভটভটিতে রওয়ানা দেন। নগরীতে চিকিৎসা নিতে আসা বরগুনার বাসিন্দা আব্দুর রহিম জানান, চিকিৎসা শেষে তার বাড়ি ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তার দেখা দিয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনিও ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে ফিরতে বিকল্প যানের সন্ধান করছিলেন। বাস টার্মিনালের শ্রমিক ও যাত্রীরা জানান, প্রশাসনের নিরব ভূমিকায় থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন কঠোর হলে কথায় কথায় তারা এ ধরনের ধর্মঘট আহবান করতে পারতো না বলে ভুক্তভোগীরা জানান। 
 
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ১৮ থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বরিশাল থেকে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট ও খুলনার ১০রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকে। প্রশাসনের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ২ জানুয়ারির বৈঠকে বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় ৩ জানুয়ারি থেকে ফের ধর্মঘট শুরু হয়। ওইদিন সকাল থেকে সরাসরি ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনার, পাথরঘাটা, মঠবাড়ীয়া, ভান্ডারিয়া, রাজাপুর, নলছিটি, মোল্লারহাট ও খুলনা রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধে টানা ১৯দিন পর ২২ জানুয়ারী পাঁচ ঘন্টা বাস চলাচলের পর পূর্ণরায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে বরিশাল থেকে পশ্চিমাঞ্চলের ১০রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে ঘিরে ২৪ জানুয়ারি থেকে প্রশাসনের আশ্বাসে আবারও বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে কোন সমাধান না হওয়ায় ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বরিশাল থেকে সরাসরি বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেই থেকে বরগুনা ও পটুয়াখালীর সবকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে ধর্মঘটে যাওয়ার পূর্বে নেতৃবৃন্দরা প্রশাসনকে ৭২ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে গত দুইদিন ধরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। এতেও কোন সুফল না পেয়ে বুধবার সকাল থেকে বরিশাল বিভাগের সবকটি রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস ধর্মঘট শুরু করা হয়।
 
ইত্তেফাক/এমআই