সৌদি প্রবাসী স্বামী আব্দুল আজিজ প্রায়ই স্ত্রী রিনাকে ফোন করে বলতো সে তাকে আর রাখবে না। সুন্দরী মেয়ে দেখে আরেকটি বিয়ে করবে। মেয়েদের ছবিও পাঠাতো স্ত্রীর রিনার কাছে। অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ ও ছেলে-সন্তান নিয়ে স্ত্রী রিনাকে বাড়ি থেকে চলে যেতেও বলতো।
শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে নালিশ করেও কোন কাজ হয়নি। তারাও বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতো তাকে। অনেক সময় গায়েও হাত তুলতো। এই অপমান সইতে না পেরে ক্ষোভে, দুঃখে রিনা আক্তার দুই শিশু সন্তানকে বিষ (ইদুঁর মারার ঔষুধ) খাইয়ে নিজেও খান। এতে রিনার মৃত্যু হয় আর ভাগ্যগুনে বেচে যায় তার অবুঝ দুই শিশু সন্তান। দুই শিশু সন্তানকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার রাতে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার বলধরা ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামে। নিহত রিনা ওই গ্রামের আবুবকর সিদ্দিকের সৌদি প্রবাসী আব্দুল আজিজের স্ত্রী। শনিবার দুপুরে তার লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
থানা পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৮ বছর আগে সিঙ্গাইর উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়নের চর-ভাকুম গ্রামের বাচ্চু মিয়ার মেয়ে রিনা আক্তারের (২৭) বিয়ে হয় একই উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের (৩৫) সাথে। এই দম্পতির ঘরে ৫ বছর বয়সী আফরিন ও দুই বছর বয়সী আব্দুল মমিনের নামে দুই সন্তানের জন্ম নেয়।
রিনার স্বামী আব্দুল আজিজ প্রায় ১০ বছর ধরে সৌদি আরব থাকেন। মাঝে মাঝে সে ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসতো। সর্বশেষ এক বছর হলো ছুটিতে এসে আবার সৌদি আরব গেছেন। কয়েক বছর ধরে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়।
গৃহবধু রিনা আক্তারের চাচা মিজানুর রহমান রিনার সঙ্গে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির অসদাচরনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন এই অপমান সইতে না পেরে ক্ষোভে-দুঃখে গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুই শিশুসন্তানকে বিষ (ইঁদুর মারার ঔষুধ) খাইয়ে রিনাও তা খান। এমন অবস্থায় প্রতিবেশিরা মুমূর্ষ অবস্থায় মা ও দুই সন্তানকে সিঙ্গাইর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। এ সময় সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রিনাকে মৃত ঘোষণা করেন। দুই শিশু সন্তানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্থানান্তর করে। তাদের অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত।
রিনা আক্তারের মামা মোহাম্মদ রঞ্জিত হোসেন জানান, বিয়ের পর বিদেশে গিয়ে ভাগ্নি জামাই আব্দুল আজিজের সব কিছু পাল্টে যায়। বেশ কিছুদিন ধরে ভাগ্নি রিনাকে তালাক দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। মোবাইলে মেয়েদের ছবি পাঠিয়ে বলতো, সে আরেকটি বিয়ে করবে। শ্বশুর বাড়ির লোকজনও রিনাকে সহ্য করতে পারতো না। এই ক্ষোভে রিনা বিষ খেয়ে শিশু-সন্তানদেরও খাওয়ান।
আব্দুল আজিজের বাবা আবু বকর সিদ্দিকের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ছেলে ও ছেলের বউ রিনার মধ্যে কিছুদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। এজন্য যে এত বড় ঘটনা ঘটবে বিষয়টি বুঝতে পারিনি। তবে ছেলের বউকে কোন সময় মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়নি বলে জানান তিনি।
সিঙ্গাইর থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) খোন্দকার ইমাম হাসান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য রিনা আক্তারের মরদেহ জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।
ইত্তেফাক/নূহু
