হেলালুর রহমান জুয়েল
কখনো তিনি মেয়ে, কখনো স্ত্রী, কখনো একজন মা। তবে এই পরিচয়ের বাইরেও তার বড় পরিচয় তিনি একজন চারুশিল্পী। বাজারের সাধারণ টিপকে রং-তুলির ছোঁয়ায় অসাধারণে পরিণত করা এই চারুশিল্পীর নাম প্রিয়াংকা সিকদার।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাঙালির সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মাদার তেরেসা, বেগম রোকেয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ নানা গুণীজনের প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে টিপে। রং-তুলির ছোঁয়ায় যে এমন ‘অসাধারণ’ কিছু হতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। শখেরবসে টিপের ওপর তৈরি করা শিল্পকর্ম তাকে এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
প্রিয়াংকা সিকদার জানালেন, তার বেড়ে ওঠা এবং টিপের ওপর প্রতিকৃতি তৈরির গল্প। রাজবাড়ির পাংশা উপজেলায় শৈশব পার করে শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী শহরের বেলদার পাড়ায় বেড়ে ওঠা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইনে মাস্টার্স শেষ করেছেন। তিনি জানান, বাবা জয়দেব সিকদার রাজশাহী নিউমার্কেটে কারুশিল্পের ব্যবসা করেন। মা নীলিমা সিকদার গৃহিণী। প্রায় ছয় বছর আগে বর্তমানে চাটমোহরের ইউএনও সরকার অসীম কুমারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের আড়াই বছর বয়সী একমাত্র সন্তান অরিত্র। শুধু ইউএনওর স্ত্রী হিসেবে নয়, কর্মময়ী একজন নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান প্রিয়াংকা।
সংসার সামলানোর পাশাপাশি পড়াশোনা, ফ্রিল্যান্সিং, পোস্টার ডিজাইন, বইয়ের কভার ডিজাইন, টি-শার্ট ডিজাইন করাসহ নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন প্রিয়াংকা সিকদার। ছোটদের জন্য ‘রবিনের একদিন’ বইয়ের ডিজাইন, ‘ছোটদের নজরুল’ নামে বইয়ের ছবির কাজ করাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনের কাজ করেছেন প্রিয়াংকা। এছাড়া চাটমোহর উপজেলায় বিভিন্ন দিবসের আমন্ত্রণপত্রের (কার্ড) ডিজাইনও তিনি করেছেন। এবার পয়লা বৈশাখে সাজের জন্যও এঁকেছেন অনেক টিপ। প্রিয়াংকা বলেছেন, একটি টিপের ওপর প্রতিকৃতি আঁকতে সময় লাগে প্রায় আধা ঘণ্টা। এই টিপ তিনি নিজে পরেন, অন্যকে উপহার দেন। ভারতের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ঊষা উত্থুপ, দেশের মধ্যে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল আঁকিবুঁকি করা টিপ পরতেন। তাদের কপালের সেই টিপ দেখে ভালো লেগে যায়। এরপর থেকেই টিপের ওপর প্রতিকৃতি আঁকানো শুরু।
স্ত্রীর এমন কাজে বেশ গর্বের সঙ্গে ইউএনও সরকার অসীম কুমার জানালেন, ‘সন্তান, সংসার সামলিয়ে সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করা সত্যি দুরূহ। আমি তার রুচি ও মননশীল কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তার কাজ আমাকে সত্যিই গর্বিত করেছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় মাস্টার্স করা এই প্রতিভাধর নারীর শিল্পকর্ম অতিসম্প্রতি সামনে আসে সবার। চাটমোহর উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত চিত্রকর্ম প্রদর্শনীতে প্রিয়াংকা সিকদারের টিপ স্থান পায়। সবার আগ্রহও ছিলো এই টিপের প্রতি।
