বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন ইন্ডিয়া

বন্ধুত্ব, সঙ্গে হূদয়ের সম্পর্ক

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:৫৭

ইশরাত বিনতে রউফ,

কাজ করেন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায়। প্রতিনিয়ত সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ান। সম্প্রতি ঘুরে এসেছেন ভারতে। এবারের বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আলাদা। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ১০০ জন বিভিন্ন পেশার মানুষ ঘুরেছেন, দেখেছেন, সংস্কৃতির অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান করেছেন, জীবন-যাপন দেখেছেন। সেসব বিষয় নিয়ে ইশরাত মহিলা অঙ্গনে লিখেছেন—

ভারতের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া-২০১৯’ শীর্ষক আয়োজন করে ইন্ডিয়ান হাইকমিশন। সাতদিনের এ সফরে বাংলাদেশের একশত তরুণ ভারতের দিল্লি, আগরা এবং হায়দ্রাবাদ এর দর্শন পায়। ২০১২ সালে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া’ শুরু হয়। এবারের দল এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পেশার ৪০ জন নারী ও ৬০ জন পুরুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন শিক্ষক, চিকিত্সক, প্রকৌশলী; তেমনি আছেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ, মডেল, সমাজকর্মীও। ২৮ মার্চ বিকেল সোয়া ৫টায় এই শতযুবাকে বহনকারী জেট এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ৯ডবি­উ২৭১ নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যায়। এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য দুই দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান প্রযুক্তিজ্ঞান বিনিময় করে নিজেদের আরো সমৃদ্ধ করা।

এই বহুল আলোচিত ডেলিগেশন এর বাছাইপ্রক্রিয়া চলে প্রায় চার মাস। এ বছর তিন হাজার আবেদনপত্র থেকে বাছাই করে ইন্টারভিউতে ডাক পড়ে ৩০০ জনের। আর সেই থেকে বেছে নেওয়া হলো ১০০ জন বাংলাদেশের সেরা তরুণকে। ২৮ মার্চ ২০১৯-এ অনুষ্ঠিত হয় ফ্লাগ অফ স্রেমনি, এই প্রথম শতযুবা এক সাথে একত্রিত এবং পরিচিত হবার সুযোগ লাভ করি।

 বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ জনগোষ্ঠীর এত বড় রাষ্ট্র চালাতে কোনো আইন প্রণয়নে যেন কোনো রকম ত্রুটি না থেকে যায় সেজন্য ভারত দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালিয়ে থাকে। লোকসভা, এটা নিম্নকক্ষ; আর রাজ্যসভা, সেটা উচ্চকক্ষ। বর্তমানে লোকসভার মোট সদস্য সংখ্যা ৫৪৫ জন। আর রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা ২৫০।

 লোকসভা এবং রাজ্যসভার অবকাঠামো একদম এক, শুধুমাত্র লোকসভার মূল রঙ সবুজ আর রাজ্যসভার রঙ লাল।

মধ্যাহ্নভোজ শেষে বাস ইন্ডিয়া গেট পৌঁছাল। ইন্ডিয়া গেট দিয়ে দিল্লি চেনা যায়। ১৯২১ সাল থেকে প্রায় ১০ বছর ধরে নির্মিত হয় ইন্ডিয়া গেট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারানো প্রায় ৯০ হাজার সৈন্যের স্মরণে গড়ে তোলা সৌধ ৪২ মিটার উঁচু। ‘ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল’। ইন্ডিয়া গেট ছাড়াও এই মেমোরিয়ালে চারটি চক্র রয়েছে। দেশমাতৃকার জন্য ত্যাগ স্বীকার করা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অবদান স্মরণে এই চক্রব্যুহ গড়ে তোলা হয়েছে। ক্যাপ্টেন শর্মা ব্রিফিং-এর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিন হাজার সেনা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের স্মরণে ‘অমর জওয়ান জ্যোতি’ যা এখানে জ্বলে ২৪ ঘণ্টা। 

শুক্রবার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ভারতের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এ আয়োজন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলাদেশ থেকে আসা শতযুবাকে স্বাগত জানিয়ে বক্তৃতা করেন ভারতের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পরিচালক এন রাজা। এরপর দুই দেশের সংস্কৃতির এমন মেলবন্ধন দেখার মতো।

এরপরে আমাদের গন্তব্য ছিল আগরা ফোর্ট। মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকদের প্রধান আবাসন এই ফোর্টলাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি চুরানব্বই একর এর এই বিশাল ফোর্ট এখনো ভারতীয় সেনাবাহিনীর আওতায়। মাত্র পঁচিশ শতাংশ দর্শনার্থীর জন্যে উন্মুক্ত। পরেরদিন হায়দরাবাদের ফ্লাইট বিকাল ৫টায়। কিন্তু তার আগে আমরা চলে গেলাম পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্ হিন্দু মন্দির অক্ষরধামে। এই মন্দিরের ভেতরে কোনো ধরনের ক্যামেরা ও ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ। এই বিশাল মন্দিরে বাগান ও ২০০ এর বেশি মূর্তি আছে, এই মন্দির তৈরিতে সারা পৃথিবী থেকে আট হাজার স্বেচ্ছাসেবী যোগদান করেছিলেন। হিন্দু ভগবান স্বামীনারায়ণ এর সম্মানে তৈরী স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম এর মতবাদ হলো অহিংসতা ও মানবিকতা। ভেতরে এক জায়গায় ধর্মীয় রীতিতে পূজা ও মনোকামনা পূরণের জন্যে স্বর্ণমূর্তিতে পবিত্র পানি ঢেলে মনোকামনা প্রকাশ করার আবহ আছে। স্বর্ণ মূর্তিটা এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার, নিখুঁত এর সংজ্ঞা আসলে ভারতীয় স্থাপত্য ও আর্ট না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়।

এরপরে ডেস্টিনেশন ছিল জওহরলাল নেহেরু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঢুকতেই স্যার জওহরলাল নেহরুর বিশাল প্রতিকৃতি, আর ভেতরে যেতেই জে এন টি ইউ এর বর্ণিল অভ্যর্থনা, ফুলের রঙের রঙ্গোলি করে লেখা ছিল স্বাগতম বাংলাদেশি ডেলিগেটস। আর পুরোটা রাস্তা জুড়ে স্বাগত জানালো ছোট্ট ছোট্ট নৃত্যরত শিশু। আমাদের সবাইকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করার পর দুই দেশের জাতীয় সংগীত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্যের পর দুই দেশের সংগীত ও নৃত্য পরিবেশিত হয়।

২ এপ্রিল, আজকে সবাই কেন জানি তাদের বেস্ট কাপড় পরে এসেছে .. আজকে অনেক ছবি তোলা হবে। বড় কারণ আজকে আমাদের গন্তব্য-লাইট ক্যামেরা একশন এর রামোজি ফিল্ম সিটি। কোটি মানুষের স্বপ্নের জায়গা রামোজি, বছরে ১৫ লাখ মানুষ দর্শনে আসেন। দুই হাজার একরের ওপর নির্মিত এই ফিল্ম সিটিকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্ স্টুডিও এর তকমা দিয়েছে। ভেতরে খোলা বাসে গাইডসহ ঘুরতে হয়, গাইড খুব হাস্যরস করেই জানিয়ে দেয় কোন বাগানে বিদ্যা বালান গড়িয়ে পড়েছিল আর কোন সিঁড়িতে শাহরুখ খান দীপিকাকে কোলে নিয়ে চেন্নাই এক্সপ্রেস-এ মন্দিরে উঠেছিল। দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের ‘যা সিমরান যা’ সবার পরিচিত। সেই ট্রেন স্টেশনে ডেলিগেটসরা শাহরুখ কাজলের মতোই ছবি তুললেন। সবচেয়ে প্রধান আকর্ষণ ছিল বাহুবলি এর সেট, বিশাল বিশাল মূর্তি আর সেই রানি মহেশমাতির সিংহাসন। তাক লাগিয়ে দেবার মতো কাঠামো তৈরি করেন ভারতীয় ফিল্ম কলাকুশলী।

শেষ দিন। প্রথমেই শর্ট ভিজিট হলো পলা গোপীচাঁদ নিমগাড্ডা ফাউন্ডেশন ব্যাডমিন্টন একাডেমিতে। আমাদের মাঝে দুইজন নারী খেলোয়াড় ছিলেন, ক্রিকেটের জাহানারা আর ফুটবল-এর মিরোনা, তাঁরা এই মাঠে তাঁদের নৈপুন্য প্রদর্শন করেন।

মধ্যাহ্নভোজ এর পর আমরা যাই সালার জং জাদুঘর দেখতে। প্রতিষ্ঠাতা নবাব মীর ইউসুফ আলী খান। ১৯৫১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম জাদুঘর। গ্যালারিতে রয়েছে হাতির দাঁতের দামি উপকরণ, পর্সেলিন, মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ফল কাটার ছুরি, সম্রাট আওরঙ্গজেবের মণিমুক্তা-শোভিত ছোরা, চীন-জাপানসহ প্রাচ্য-পাশ্চাত্য থেকে আনা অসংখ্য দামি মণি-মুক্তা, টিপু সুলতানের হাতির দাঁতের চেয়ার, একটি পাথরে নির্মিত মূর্তি আছে, যেটিকে সামনে থেকে পুরুষ অথচ পেছনের আয়নায় নারীর অবয়ব দেখা যায়।

আমাদের সর্বশেষ স্থান হলো গোলকোন্ডা ফোর্ট। এই কেল্লায় আছে রাজপ্রাসাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত রিমেইন্স, মসজিদ ও মন্দির একসঙ্গে এবং পাহাড়চূড়ায় একটি প্যাভিলিয়ন। এই প্যাভিলিয়ন প্রায় ১৩০ মিটার উঁচু, যেখান থেকে পুরো হায়দ্রাবাদ শহরকে বার্ডস আই ভিউ দেখা যায়। সন্ধ্যা ৭ থেকে ৮টা পর্যন্ত লাইট এন্ড সাউন্ড শো হয় এখানে, যার মাধ্যমে এই এলাকা ও এই ঐতিহাসিক ফোর্ট এর ইতিহাস ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়। যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে এই পুরো ডেলিগেশনে কোন স্থানটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, আমি বলবো গোলকোন্ডা ফোর্ট এর ওপরে উঠে পুরো ফোর্টটা সূর্যাস্তের ক্ষীণ আলোতে দেখাটা সবচেয়ে জাদুকরী ছিল।

আমরা এই সাতদিনে অগণিত স্মৃতি সঞ্চয় করেছি, বন্ধুতার হাত বাড়িয়েছি, বাতাস আর বৃষ্টিকণার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। এসব ছেড়ে যেতে হচ্ছে, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এসেছি অনেক অজানাকে জানা জ্ঞান, অনেক সম্ভাবনা, হায়দ্রাবাদ থেকে কলকাতা আর কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছাতে ঢাকায় সময় রাত সাড়ে আটটা বাজলো।

এরকম ডেলিগেশন-এর মূল উদ্দেশ্য থাকে তরুণ মস্তিষ্ক ও তরুণ আইডিওলজির সেতুবন্ধন, এই ডেলিগেশনে আমার প্রাপ্তি যদি বলি, কিছু অসম্ভব মেধাবী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি, যাদের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু রয়েছে, পেশাগত ভাবে যুব সমাজ নিয়ে কাজ আমার, ভবিষ্যতে সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করার অনেক ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেয়েছি, ভারতীয় বন্ধু ও ভ্রমণের স্থানসমূহ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি, যে সব স্থানে ভারতীয় মানুষও যেতে পারে না অনেক সময় সেসব জায়গায় যেতে পেরেছি। সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো একশো তরুণ একত্রিত হতে পেরেছি, বন্ধু রাষ্ট্র ভারত, বন্ধুত্বেরও ঊর্ধ্বে এখন এ সম্পর্ক, এ সম্পর্ক আত্মার ও আত্মীয়তার।