কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে প্রসূতির পেটে নবজাতকের মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন ও জরায়ু কেটে ফেলার ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালক, জেলা সিভিল সার্জন ও সংশ্লিষ্ট ৫ চিকিৎসকসহ সাতজনকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। আগামী ৪ এপ্রিল তাদের স্ব-শরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রবিবার হাইকোর্টের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন।
জানা যায়, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান, ব্যারিস্টার ফারহানা ইসলাম খান, আনিসুল হাসান ও সেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। এই ঘটনায় আগামী ৪ এপ্রিল আদালতে হাজির হয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, কুমিল্লার সিভিল সার্জন, গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. করুনা রানী কর্মকার, ডা. নাসরিন আক্তার পপি, ডা. জানিবুল হক, ডা. দিলরুবা শারমিন ও ডা. আয়েশা আফরোজকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে আইনজীবী সেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি জানাজানি হয় শনিবার। জুলেখা বেগম নামের ওই প্রসূতি গত এক সপ্তাহ ধরে সন্তান ও শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারিয়ে হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছেন, তাই জনস্বার্থে আদালত এ রুল জারি করে।
অপারেশনে অংশ নেয়া হাসপাতালের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. করুনা রানী কর্মকার সাংবাদিকদের জানান, প্রসূতির গর্ভের সন্তান মৃত ও অস্বাভাবিক পজিশনে ছিল। কিন্তু শিশুটির হাত-পা জরায়ু মুখ দিয়ে বের হয়ে আসায় বাধ্য হয়ে অপারেশনের মাধ্যমে মৃত শিশুর দেহ ও মাথা বিচ্ছিন্ন করে আলাদাভাবে বের করা হয়েছে।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রোগীর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তার স্বামীর অনুমতি নিয়ে আমরা জরায়ু কেটে ফেলি, এতে ডাক্তারদের অবহেলা ছিল না বলে তারা দাবি করেন।
রবিবার বিকালে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. মজিবুর রহমান জানান, কুমেক হাসপাতালের বিষয়টি একান্তই ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অধীন। যেহেতু এ ঘটনায় আমাকেসহ ৭জনকে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য মহামান্য হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছে, তাই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় সাধন করে আগামী ৪ এপ্রিল এ ব্যাপারে আদালতে ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কোনো অদক্ষতা প্রমাণিত হলে মহামান্য হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দেবেন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুমেকের পরিচালক ডা. স্বপন কুমার অধিকারী জানান, এ বিষয়টি তদন্ত করতে ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে। এ বিষয়ে তদন্তের পর দায়িত্বে কারও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে রবিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই প্রসূতি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
উল্লেখ্য, জেলার মুরাদনগর উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের সফিক কাজীর স্ত্রী জুলেখা বেগম (৩০) প্রসব বেদনা নিয়ে ১৭ মার্চ রাতে কুমেক হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন দুপুরে অপারেশন থিয়েটারে হাসপাতালের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. করুনা রানী কর্মকারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের চিকিৎসক দল ওই অপারেশন করেন। ডা. নাসরিন আক্তার পপি, ডা. জানিবুল হক, ডা. দিলরুবা শারমিন ও ডা. আয়েশা আফরোজসহ অন্যরা অপারেশনে অংশ নেন। এ সময় জুলেখার অপারেশন করে তার নবজাতকের মাথা বিচ্ছিন্ন এবং জরায়ু কেটে ফেলা হয়।
ইত্তেফাক/আরকেজি
