পঞ্চগড়ে বন্ধ হচ্ছে না বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলন!

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০৮

মাটিতে সৃষ্টি হচ্ছে শূন্যতা। কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা। প্রশাসনের অভিযানে ১৬৯টি ড্রেজার মেশিন জব্দ। জড়িত অভিযোগে শতাধিক ড্রেজার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা

সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ, পঞ্চগড় প্রতিনিধি

পঞ্চগড় জেলায় অবৈধভাবে ড্রিল ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এ ব্যাপারে প্রতিবারই আলোচনা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসন এবং মাঝে মাঝে টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানও পরিচালনা করছে। তবুও কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না এ মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন।

গত মাসে অনুষ্ঠিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিক সদস্য তেঁতুলিয়ায় বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের অভিযোগ তুলে অবিলম্বে পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

 ‘ড্রেজার হটাও, পঞ্চগড় বাঁচাও-ড্রেজার মুক্ত পঞ্চগড় চাই’ এমন দাবিতে বিভিন্ন শ্রমিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকারের দাবিতে সভা সমাবেশ, মানববন্ধন করে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় বোমা মেশিন মালিকরা ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে ৮০-১২০ ফুট গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করছে। এতে মাটির নিচে সৃষ্টি হচ্ছে শূন্যতা। এর ফলে ভূমিক্ষয়, ভূমিধস, ভূমিকম্পসহ কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, হাইকোর্টের মাধ্যমে সারা দেশে ড্রিল ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর, দেবীগঞ্জ ও আটোয়ারী উপজেলার  ডাহুক, করতোয়া, তালমা, সাওসহ বিভিন্ন নদী, সরকারি খাসজমি এবং লিজ নেওয়া জমি থেকে তিন শতাধিক ড্রিল ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।

এদিকে, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের অভিযোগে তেঁতুলিয়া উপজেলার পেদিয়াগজ গ্রামের কালাচান মিয়ার ছেলে শেখ ফরিদের (৩৭) নামেই রয়েছে ১৪টি মামলা। মামলাগুলোর বাদী রাষ্ট্রপক্ষ। প্রত্যেকটি মামলাই বিচারাধীন। শুধু শেখ ফরিদ নয় বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনে জড়িত প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ীর নামে প্রায় শতাধিক মামলা চলমান রয়েছে। কিন্তু এই অপরাধে আজ পর্যন্ত কোনো আসামিরই শাস্তি হয়নি। এ ব্যাপারে পঞ্চগড় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পঞ্চগড় নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এরশাদ হোসেন সরকার জানান, ড্রেজার মেশিনের মামলাগুলো তেমন শক্তিশালী নয় বলে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে পঞ্চগড় পরিবেশ পরিষদের সভাপতি ও সরকারি মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রধান তৌহিদুল বারী বাবু জানান, ড্রেজার বা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর তোলায় গভীরে বিশালাকার শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে মাঝারিমাত্রার ভূমিকম্প হলেই ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

তেঁতুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, পুলিশের নাম করে অনেকে চাঁদাবাজি করছে এটা কানে এসেছে। বোমা মেশিন নিয়ে আমরা অত্যন্ত তত্পর রয়েছি। তবে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় পুলিশের একার পক্ষে বোমা মেশিন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবলসহ নানান সীমাবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন চাইলেই সহযোগিতা করা হয়।

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস জানান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা করা হয়েছে। নিয়মিত মামলা করা হয়েছে কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আবারো পাথর উত্তোলন করছে। অনেক মেশিন জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও বন্ধ হচ্ছে না। এ পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১৬১টি ড্রেজার মেশিন জব্দ করেছি।

পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবু হানিফ জানান, ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত গত ১০ বছরে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর আবাদি সমতল ভূমি কেটে পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। পাথর তোলার পর এসব জমি পতিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে গত ১০ বছরে এই জেলায় প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য কম উত্পাদন হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন আহমদ জানান, আমার জানা মতে বর্তমানে বোমা মেশিন চলছে না। মাঝে-মধ্যে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। কোথাও বোমা মেশিন চললে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন মাঝে-মধ্যে ড্রেজার বিরোধী অভিযান চালিয়ে আসছে। গত এক বছরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় টাস্কফোর্সের অভিযানে ১৬৯টি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস ও জব্দ করা হয়েছে। ২৪টি ড্রাম এবং ২০ হাজার ৭৫ ফুট রিং পাইপ জব্দ করা হয়েছে।