চট্টগ্রামে অপরাধীদের হাতে হাতে অবৈধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে। এর ব্যবহারও বেড়েছে বেপরোয়াভাবে। এসব ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল ও এলজি। অপরাধমূলক তত্পরতায় এসব অস্ত্রের যোগান সম্প্রতি বেড়েছে বলে কয়েকটি সূত্র থেকে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক মাসে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরীতে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি অপরাধীরা ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ উত্কণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ নগরীর গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের উপ-নির্বাচনে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষ হয়ে অবৈধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য মহড়া দিয়েছে। তারা জনমনে ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে গুলিবর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা উদ্ধার করলেও অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নগরীর সাধারণ মানুষ অস্ত্রের এই প্রকাশ্য ব্যবহারে শংকা ও উদ্বেগের গভীরে পৌঁছেছেন।
নগরীর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের একাধিক সূত্র থেকে বলা হয়, চট্টগ্রাম প্রায় সব ধরনের অপরাধেই ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন এবং ব্যবহার বেড়ে গেছে। যেসব অপরাধমূলক তত্পরতায় এগুলো ব্যবহার হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিবদমান ছাত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষ, খুন, গুপ্তহত্যা, অপহরণ, ডাকাতি, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি। অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণকারী এক শ্রেণির গডফাদার বা মাস্টারমাইন্ড এসব অবৈধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র তাদের গোপন উত্স থেকে সরবরাহ করে থাকে বলেও তথ্য মিলেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ভাড়ায় প্রদান করা এবং কেনা-বেচায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিন্ডিকেট উত্সাহের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের সিন্ডিকেটের পালের গোদারা ধরা পড়েছে বলে কোনো তথ্য নেই।
কয়েক বছর আগে অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র ধরা পড়ার পাশাপাশি এগুলো বিভিন্ন সীমান্ত পথে, কখনোবা বঙ্গোপসাগর দিয়ে আসছে বলেও তথ্য পাওয়া যায়। দেড় দুই লাখ টাকায় গুলিসহ একটি পিস্তল এবং পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকায় গুলিসহ ১টি এলজি বেচা-কেনার তথ্য ইতিপূর্বে শোনা গিয়েছিল।
এদিকে মাস খানেক আগে নগরীর ষোলশহর এলাকায় পাঁচলাইশ থানার টহল দলের একজন এসআই মোটর সাইকেল আরোহী সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। প্রায় ১৫ দিন পর পুলিশ অবশ্য অবৈধ পিস্তলটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। গত ৩০ মার্চ, হাটহাজারী পুলিশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলে অভিযান চালিয়ে দুই বস্তা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করে। গত ক’মাসে চবি ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনের দুটি বিবদমান গ্রুপের বেশ কিছু সংঘর্ষে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সাধারণ ছাত্ররা গুলির শব্দ শুনতে পেলেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও তার ব্যবহারকারীদের ধরা যায়নি। গত ১৮ মার্চ নদীর দক্ষিণ পাড়ে নগরীর কর্ণফুলী থানাধীন শিকলবাহায় যে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে- সেখানে ডাকাতরা ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বলেও জানা যায়। এ ছাড়া গত ক’বছর আগে নগরীর সিআরবি-তে টেন্ডার দখল নিয়ে দুই পক্ষের গোলাগুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও নগরবাসী এখনো উদ্বেগের সঙ্গে স্মরণ করেন।
অভিযোগ আছে ভারত, মিয়ানমার এবং পার্বত্যাঞ্চল সংলগ্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে দুর্বৃত্তরা অবৈধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র এনে থাকে। মাদক পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো থেকে অবৈধ অস্ত্র পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো বেশি শক্তিশালী বলে বিভিন্ন সূত্রের অভিমত।
এ ব্যাপারে আলাপকালে চট্টগ্রাম মহানগরী পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) আমেনা বেগম ইত্তেফাককে বলেন, নানা ধরনের অপরাধীদের কাছে যে অজানা সংখ্যক ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র আছে তা সঠিক। অস্ত্রসহ অপরাধী ধরা পড়লে অস্ত্রের গায়ে লেখা থেকেই বোঝা যায় সেটি কোন দেশের। তিনি বলেন, অস্ত্র পাচার ও কেনা-বেচাকারী চক্র দুর্গম পথ ও সীমান্তকেই বেছে নেয়। অস্ত্র কিনে এনে নানা অপরাধমূলক কাজে ভাড়া দেওয়ার কথা শুনেছেন বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্রের মধ্যে অটোমেটিক সেমি-অটোমেটিক দুই ধরনের পিস্তলই রয়েছে। অস্ত্রসহ কেউ ধরা পড়লে বর্তমানে তার সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছরের জেল। তিনি জানান, সম্প্রতি গোসাইলডাঙ্গায় যারা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করেছে তাদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সংগঠন পিপলস ভয়েসের প্রেসিডেন্ট শরিফ চৌহান ইত্তেফাককে বলেন, নগরীতে নানা অপরাধমূলক কাজে যেভাবে ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও ব্যবহার করা হচ্ছে তা গভীর শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
ইত্তেফাক/নূহু
