প্রতারণার ফাঁদ পাততে গ্রাম থেকে লোক ভাড়া

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৮, ০২:০৩

রাজধানীতে প্রতারণার জন্য গ্রাম থেকে লোক ভাড়া করছে একটি চক্র। প্রতারণার প্রতি ‘ট্রিপ’ শেষে  বকশিশ সর্বোচ্চ ২ হাজার থেকে ৩ হাজারের মধ্যে। প্রতারণা কাজে ভাড়ায় ব্যবহার হওয়া এসব লোকের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে-এমনই তথ্য জানিয়েছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত দুই ব্যক্তি। তারা হলেন আলমগীর হোসেন (৪০) ও ইছাউর রহমান (২৯)। প্রতারণার জন্য তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে দুইদিন আগে গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) একটি টিম তাদের গ্রেফতার করে। তবে তাদের প্রতারণায় লাগানোর প্রধান হোতা কথিত জামাই জাকিরকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, একটি সময় ছিল ফরিদপুর ও শরীয়তপুর এলাকার বেশ কয়েকটি চক্র মোবাইল ফোনে শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয় দিয়ে রাজধানীতে বিভিন্ন জনের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করত। কিন্তু বর্তমানে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে ওই সব প্রতারক এখন নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা গ্রামের সহজ সরল অভাবী লোকজনকে টাকার লোভ দেখিয়ে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করছে। এমন বেশ কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে আমরা কাজ শুরু করছি।

গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ইছাউর রহমান জানান, তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার আইজায়। বিবাহিত, দু’ সন্তানের জনক। গ্রামে দিনমজুরের কাজ করতেন। রাজধানীতে আসার অভিজ্ঞতা তার খুব বেশি দিনের নয়। কয়েকমাস আগে মুকসুদপুর বাজারে দেখা হয় কথিত জামাই জাকিরের সঙ্গে (তার বাড়ির ঠিকানা তিনি জানেন না)। তার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া আলমগীর হোসেনই তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। পরিচয়ের সময় বলা হয়, জামাই জাকির ঢাকায় থাকেন। তিনি একজন বড় ব্যবসায়ী। তিনি মূলত রিয়াল, ডলারের ব্যবসায় জড়িত। এছাড়াও রাজধানীতে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার (জামাই জাকির) ব্যবসা দেখভালের জন্য তার দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে প্রচুর লোকের প্রয়োজন হয়। ইছাউর তার (জাকির) কথায় আকৃষ্ট হয়। এসময় জামাই জাকির তাকে প্রস্তাব দেয়, তার সঙ্গে কাজ করার জন্য। আর এ কাজের জন্য তাকে ঢাকায় ২/১ দিনের বেশি অবস্থান করতে হবে না। আর  প্রতি ট্রিপে  দেওয়া হবে (একদিন বা দুইদিনের জন্য ঢাকায় গেলে) ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। প্রয়োজনে এ টাকা আরও বাড়ানো হবে। ঢাকায় পৌঁছে কী কী করতে হবে তারও মোটামুটি একটা ধারণা দেয় জাকির। এর কিছুদিন পর ইছাউরকে ঢাকায় আসার ভাড়া  বাবদ জাকির বিকাশের মাধ্যমে এক হাজার টাকা পাঠায়। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে পঙ্গু হাসপাতাল এলাকায় জাকিরের নির্দেশ মতো কাজ করে। পরে জাকির তাকে বখশিশ হিসেবে দু’হাজার টাকা দেয়। এ ঘটনা মাস খানেক আগের। তবে দ্বিতীয় কাজটি করতে গিয়ে ফার্মগেট এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ইছাউর নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, প্রথমদিকে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেনি। কারণ ঢাকায় পা দেওয়ার পর দেখেছেন ফরিদপুর, গোপালগঞ্জের অনেকেই তার মতো প্রতারণার কাজে ভাড়ায় খাটছে। তারাও ঢাকায় আসে এক বা দুদিনের জন্য। আর ঢাকায় অবস্থানকালে তাদের অবস্থান হয় ফুটপাত, বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশন। একই ধরনের তথ্য দেয় আলমগীর হোসেন। তারও গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার মহারাজপুরে। তিনি জানিয়েছেন, প্রথম দিকে না জেনেশুনেই ঢাকায় এসে প্রতারকদের নির্দেশ মতো কাজ করেছেন। এখন জেনেশুনেই করছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে আলমগীর হোসেন বলেন, প্রতারণার নানা ধরন আছে। তবে লোভী মানুষেরাই তো বেশি প্রতারণায় পড়ে। ফলে তারা প্রতারিত হলেও খুব একটা থানা পুলিশ করে না। জামাই জাকিরের মতো প্রতারক চক্র কত হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংখ্যা বলা মুস্কিল। তবে তাও শয়ের উপরে হবে ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম বলেন, এ চক্রটির প্রধান হোতা জাকিরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে ওটা তার আসল নাম কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। প্রতারণার ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল এরা প্রয়োগ করে থাকে। প্রথম দফায় প্রতারক চক্রের মূল হোতারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে আগে লোক বাছাই করে। এরপর প্রথমে একটি রিয়াল বা ডলার দেখিয়ে (যা তারা চেনে না)  বিশ্বাস অর্জন করে এবং মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে। পরে সুবিধামতো সময় ফোন করে জানায়, স্যার গুলশান-বনানীতে বাসা-বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে রিয়াল ও ডলারের প্যাকেট পেয়েছে। কথাবার্তায় বনিবনা হলে, ভাড়ায় করা লোকজনকে নিয়ে গামছায় মোড়ানো প্যাকেট পাঠায় (যার ভেতরে কাগজ, উপরে থাকে এক বা দুইটি রিয়াল)। নির্ধারিত লোকের হাতে দিয়ে দ্রুত টাকা নিয়ে সরে পড়ে। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতরা আরও কয়েকটি প্রতারক চক্রের ব্যাপারে তথ্য দিয়েছে। তাদের গ্রেফতার করা গেলে আরো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

ইত্তেফাক/নূহু