ওয়াসার ৬২ ভাগ গ্রহীতা দুর্নীতির শিকার

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ২১:২০

ঢাকা ওয়াসার সেবা নিতে গিয়ে ৬২ ভাগ গ্রহীতা দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ গ্রাহক ঘুষ বা নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ আদায়, ৫১ শতাংশ দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ২১ শতাংশ সময়ক্ষেপণ, ২৩ শতাংশ ভৌতিক বিলের মতো দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। সার্বিকভাবে ওয়াসার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবায় অসন্তুষ্ট ৩৭ শতাংশ গ্রাহক। এছাড়া ওয়াসার পানির মান খারাপ হওয়ায় ৯১ শতাংশ গ্রাহককে ফুটিয়ে পান করতে হয়। এজন্য বছরে আনুমানিক ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস খরচ হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

‘ঢাকা ওয়াসা:সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল বুধবার টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের প্রমুখ। গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রণয়ন ও উপস্থাপন করেন টিআইবির প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো.শাহনূর রহমান এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শহিদুল ইসলাম। ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম গ্রাহকবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে ১৩ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি।

গবেষণায় দেখা গেছে, সিস্টেম লস কমিয়ে আনা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিলের তথ্য জানা এবং মোবাইল ফোন ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ ব্যবস্থার মতো ঢাকা ওয়াসার উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অর্জন ও উদ্যোগ রয়েছে। তবে এখনো প্রতিষ্ঠানটির নানা কার্যক্রম পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান রয়েছে।

টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পানির উত্পাদন ব্যবস্থায় ঘাটতির কারণে গত ১০ বছরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে পাম্পের সংখ্যা বেড়ে ৪৮২টি থেকে ৯০০টিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখনো ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা ৭৮ শতাংশ। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর ২ থেকে ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। অপরদিকে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সেবা গ্রহীতাদের ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ চাহিদা অনুযায়ী পানি পান না। জরিপে অংশ নেওয়া ২০ দশমিক ৬ শতাংশ সেবা গ্রহীতা সারাবছর এবং ৯৪ শতাংশ সেবা গ্রহীতা গ্রীষ্মকালে পানি ঘাটতির সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

ওয়াসার পানি সরবরাহ ও বিলিং ব্যবস্থায় ন্যায্যতার ঘাটতির পাশাপাশি পানির মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সেবা গ্রহীতাদের ৫১ শতাংশ পানি অপরিষ্কার এবং ৪১ শতাংশ পানিতে দুর্গন্ধের অভিযোগ করেছেন। সেবা গ্রহীতাদের ২৫ শতাংশ সদস্য কোনো না কোনো পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া পানির নিম্নমানের কারণে ৯১ শতাংশ গ্রাহক পানি ফুটিয়ে পান করছেন। এজন্য বছরে গ্যাস খরচ প্রায় ৩৩২ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৬২০ টাকার।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা ওয়াসার নিয়োগ, পদায়ন ও বদলি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণসহ ক্রয় প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন, মিটার রিডিং নেওয়া এবং সর্বোপরি গ্রাহক সেবায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান। জুলাই ২০১৭ হতে জুন ২০১৮ সময়কালে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সংক্রান্ত সেবা বা সমস্যা নিয়ে ঢাকা ওয়াসার সাথে যোগাযোগকারী সেবা গ্রহীতার ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ নানা ধরনের অনিয়ম, হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ওয়াসার কাছ থেকে ঢাকাবাসীর প্রত্যাশিত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনেক ঘাটতি বিদ্যমান। এর অন্যতম কারণ ঢাকা ওয়াসার সুশাসন ও শুদ্ধাচারে ঘাটতি। ঘুষ আদান-প্রদানের বিষয়টি পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে হওয়ার কারণে প্রকৃত দুর্নীতিবাজকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন চাইলে দুর্নীতির প্রকৃত অবস্থা উন্মোচন করা সম্ভব। টিআইবির পক্ষ থেকে ওয়াসার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবার মূল্য নির্ধারণে স্বতন্ত্র রেগুলেটরি কমিশন গঠন, শূন্য পদগুলোতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে জনবল নিয়োগ, অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রণোদনার ব্যবস্থা চালুসহ ১৩টি সুপারিশ করা হয়েছে।