এম এ আলআমিন
এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্রের দেশ শ্রীলঙ্কা। দেশটি এখন নজীরবিহীন সাংবিধানিক সঙ্কটের মুখোমুখি। যার প্রভাব অভ্যন্তরীণ সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে আঞ্চলিক পরিমণ্ডলেও। সমস্যার শুরু ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা বরখাস্ত করার পর।
বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করে মাইথ্রিপালা তার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী ও শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসান। রাজাপাকসে যেন পার্লামেন্টে নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ম্যানেজ করতে পারেন সে লক্ষ্যে পার্লামেন্টের চলমান অধিবেশন বাতিল করেন সিরিসেনা। যখন দেখা গেল রাজাপাকসের পক্ষে তা সম্ভব নয় সিরিসেনা তখন পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে ৫ জানুয়ারি নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। কিন্তু পার্লামেন্ট ১৫ নভেম্বর অনাস্থা ভোট এনে রাজাপাকসেকে বিদায় করে। রাজাপাকসে অনাস্থা ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার কানু জয়সুরিয়ার তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার কোনো অধিকার নেই।
এদিকে সিরিসেনার কেবিনেটের দু’জন মন্ত্রী ২৩ নভেম্বর বলেন, তারা স্পিকার হিসেবে কানু জয়সুরিয়াকে মেনে নেবেন না। এর আগে স্পিকার বলেছিলেন যে, দেশে কোনো প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভা নেই। রাজাপাকসে ও বিক্রমাসিংহের সমর্থকরা এখন রাজপথে বিক্ষোভ করছে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুই শিবিরের মধ্যে রশি টানাটানির মধ্যেই ১৯ নভেম্বর একটি সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে সিরিসেনার মধ্যস্থতায় রাজাপাকসে ও বিক্রমাসিংহের মধ্যে বৈঠক হয়। দুই ঘণ্টা ধরে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। প্রত্যেকে নিজেকে বৈধ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দাবি করছেন।
যদিও সমস্যা সমাধানের আপাতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করেন, ক্ষমতা লোভী রাজনীতিকরা দেশকে যদি ধ্বংসের দিকে নিয়ে না যান তবে সঙ্কট একটি ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। সেটি হলো ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিভাজনের জায়গাটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়া।
দীর্ঘ সময় গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেলেও শ্রীলঙ্কার গণতন্ত্রের ইতিহাস অত্যন্ত পুরনো। শ্রীলঙ্কাকে বলা হয় এশিয়ার পুরনোতম গণতন্ত্রের দেশ। যে গণতন্ত্র একনাগাড়ে চালু রয়েছে, কোনো কারণে তাতে ছেদ পড়েনি। সীমিত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে মাত্র চারজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিয়ে ১৯১০ সালে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯২০ সাল নাগাদ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা ১৬ এবং ১৯২৪ সালে ৩৪ জনে উন্নীত হয়। ১৯৩৪ সালে ১৮ বছরের ওপর সব নাগরিক ভোটাধিকার পায় এবং ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটিতে ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্ট চালু হয়। ১৯৭২ সালে দেশটির নাম সিংহল পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কা রাখা হয়।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল অবধি দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলে। স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলাম (এলটিটিই) সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তামিল নেতা ভেলু পিল্লাই প্রভাকরণ ১৯৭৬ সালে মিলিশিয়া গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৯ সালের ১৮ মে লড়াইরত অবস্থায় তিনি নিহত হন। এর মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটে গৃহযুদ্ধের। ওই সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজাপাকসে। অভিযোগ রয়েছে, যুদ্ধে সরকারি বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে এবং বহু বেসামরিক তামিল নিহত হয়। রাজাপাকসের সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন সনথ ফনসেকা, পরবর্তীতে তার সঙ্গে রাজাপাকসের মতবিরোধ ঘটে।
২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারির নির্বাচনে সিরিসেনা ও বিক্রমাসিংহে রাজাপাকসেকে হটিয়ে দেন। তামিল সিরিসেনা এক সময় সিংহলী রাজাপাকসের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। যাহোক সিরিসেনা ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করে। রাজাপাকসে কঠোর হাতে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতেন। সিরিসেনা ওসব বাধানিষেধ অপসারণ করেন। তাছাড়া তিনি দেশে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ডাক দেন। তামিল জনগণ তাদের হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধতে শুরু করে।
তবে সিরিসেনার সর্ব সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তামিলদের হতাশ করবে নিঃসন্দেহে। দেশটিতে ফের বিভক্তির সুর স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। সমাধানের একমাত্র পথ এখন আলোচনা। কিন্তু সেই আলোচনা প্রথম দফায় ব্যর্থ হয়েছে। নতুন করে সমঝোতার কী উদ্যোগ নেওয়া হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। দেশটি এখন যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে তা থেকে বেরোনোর পথ এখন রাজনীতিকদেরই বের করতে হবে।
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিকদের সামনে সময়টা এখন এমন যে তাদের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে। কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক একে ‘ম্যাগনা কার্টা ক্ষণ’ বলে অভিহিত করছেন। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আর খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণ করা যাবে না, এরকম একটি সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারেন। জনগণের সমর্থন নিয়ে যারা প্রতারণা করবেন তাদের একনায়ক শাসক বা রাজন্যের মতো বিবেচনা করা হবে। যারা জনগণকে অবদমিত অবস্থায় রেখে সম্পদের পাহাড় গড়তো।
শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক সঙ্কট শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়, যাতে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টিভে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম দুই বছর যেভাবে ক্ষমতার ছড়ি ঘুরিয়েছেন পরবর্তী দুই বছর সেটি পারবেন না। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে এতদিন পর্যন্ত রিপাবলিকানদের প্রাধান্য ছিল। এখন তাকে ডেমোক্র্যাটদের বাধা পেরোতে হবে। মার্কিন ব্যবস্থা মূলত ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ফরাসী রাজনৈতিক দার্শনিক মোঁতাসকিউ ‘স্পিরিট অব দ্য ল’ বইতে প্রথম বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছিলেন। ফরাসী বিপ্লবের পেছনে যেসব বুদ্ধিজীবীর অবদান ছিল তাদের মধ্যে মোঁতাসকিউ অন্যতম। আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও তার এই দর্শনের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। মূল কথা হলো রাষ্ট্রের কোনো একটি প্রতিষ্ঠান এককভাবে সব ক্ষমতা ভোগ করবে না বরং নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি অবস্থায় থাকবে।
শ্রীলঙ্কার সংবিধান এ পর্যন্ত ১৯ বার সংশোধিত হলেও ক্ষমতা পৃথকীকরণ নিশ্চিত হয়নি। তবে সিরিসেনা ২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি নিজে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কিছুটা ছেঁটে দিয়েছিলেন। দেশটির রাজনীতিকদের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারতের হাত রয়েছে। ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা শ্রীলঙ্কায় প্রভাব বিস্তারে তত্পর ভারত ও উদীয়মান অর্থনীতি চীন।
বিক্রমাসিংহে ভারতের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে সিরিসেনার ঝোঁক চীনের বিনিয়োগের প্রতি। বিক্রমাসিংহের প্রশাসন দক্ষিণে হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ চীনের গুরুত্ব কয়েকটি প্রকল্প স্থগিত করেছিল। সিরিসেনা যেখানে চীনের বেশি বেশি বিনিয়োগের আশা করছেন, সেখান বিক্রমাসিংহের এই পদক্ষেপকে ভালোভাবে নেননি সিরিসেনা ও তার সমর্থকেরা। যা হোক, সিংহল দ্বীপের রাজনীতিকরা কোন পথ বেছে নেন তাই এখন দেখার বিষয়।
