দুই সন্তানসহ মায়ের মৃত্যু: আত্মহত্যা নাকি খুন, রহস্যের জালে তদন্ত

আপডেট : ০৪ মে ২০১৮, ১৫:৩৫
হাসিবুল হাসান জাতীয় সংসদের সহকারী লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান আর স্ত্রী জেসমিন আক্তার (৩৫) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহকারী হিসাবরক্ষক। দুই মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৮) ও আদিবা তাহসিন হানিকে (৫) নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। রাজধানীর দারুস সালাম থানা এলাকার পাইকপাড়া সি-টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪নং ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তারা। গত সোমবার সন্ধ্যায় ওই বাসা থেকে হাসিবুলের স্ত্রীসহ দুই সন্তানের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 
 
নিহতদের পরিবার ও পুলিশ দাবি করছে, সে সময় কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পাশের কক্ষে হাসিবুলের ভাগ্নে ও ভাগ্নি থাকেন। আরেক কক্ষে জেসমিনের খালাতো বোন রেহেনা পারভীন যুথী থাকেন। তারাও বিষয়টি টের পাননি বলে দাবি করেছেন। পরে হাসিবুল ও জেসমিনের ভাই শাহীনুর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে মা ও দুই মেয়ের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান।
 
দুই সন্তানকে হত্যা করে মা গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন-এমন ধারণা থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। অবশ্য এটি তার অসুুখের কারণে নাকি অন্য কারণে, নাকি তাদের তিনজনকেই হত্যা করা হয়েছে-এমন বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান।
 
পুলিশ জানায়, কক্ষের ভিতর বিছানার ওপর দুই সন্তানের রক্তাক্ত লাশ ছিল। মেঝেতে পড়েছিল জেসমিন আক্তারের লাশ। জেসমিনের ডান হাতের দিকে একটি রক্ত মাখা ছুরি পড়েছিল। হলুদ রঙের কাঠের বাট যুক্ত ছুরিটি বাসায় ব্যবহূত হয়েছে কি-না এ ব্যাপারে স্বামী হাসিবুল পুলিশের কাছে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পুলিশ ধারণা করছে, ছুরিটি জেসমিন ঘটনার দিন সকালে কিনেছিলেন।
 
পরিবার দাবি করছে, জেসমিন আক্তারের মাইগ্রেনের সমস্যা ছিল। ব্যথা উঠলে চিত্কার করতেন। এরই মধ্যে ঢাকায় দুইজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে তারা দেখিয়েছেন। কয়েকদিন আগে জেসমিন তার দুই সন্তানকে ঘুমের ওষুধও খাইয়েছিলেন। হাসিবুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে এবং জেসমিনের বাড়ি পাশের ঠাকুরগাঁও জেলায়।
 
জেসমিন আক্তারের খালাতো বোন রেহেনা পারভিন জানান, কয়েক বছর আগে হঠাত্ করে স্ত্রী জেসমিনের তীব্র মাথা ব্যথা শুরু হলে ডাক্তার দেখানো হয়। ডাক্তার জানান, তার মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে। তখন থেকে প্রায়ই মাইগ্রেনের সমস্যায় অসুস্থ থাকতেন জেসমিন। মাথা ব্যথায় অনেক সময় জোরে জোরে চিত্কার চেঁচামেচিও করতেন তিনি। বাধ্য হয়ে স্বামী হাসিবুল হাসান তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু তাতে রাজি হননি জেসমিন।
 
গতকাল দুপুরে পাইকপাড়ার সরকারি কলোনির কোয়ার্টারে গিয়ে হাসিবুলসহ পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে জেসমিনের ভাই শাহীনুর মোবাইল ফোনে জানান, তারা তিনজনের লাশ দাফন করতে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছেন।
 
এদিকে নিহত মা ও দুই মেয়ের মরদেহের ময়নাতদন্তে ধারালো অস্ত্রের গুরুতর জখম পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সেলিম রেজা। মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ডা. সেলিম জানান, নিহত মা ও তার দুই মেয়ের শরীরে ধারালো অস্ত্রের গুরুতর জখম রয়েছে। ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের পুরো রিপোর্ট হাতে আসলে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ওই চিকিত্সক আরও জানান, নিহত ব্যক্তিদের ভিসেরার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এতে তারা মৃত্যুর আগে কিছু খেয়েছিলেন কি না, তা জানা যাবে।
 
পুলিশের দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাসার দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তিনজনের লাশ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। এরপরে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে।
 
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম-কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মা জেসমিন আক্তার দুই শিশুকন্যাকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যা করেছেন। কারণ ওই ফ্ল্যাটের রুমের দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। তবে এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা অন্য কারো যোগসাজশ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে এই হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
 
ইত্তেফাক/সেতু