অভিজাত পোশাকে রঙিন ঈদ

আপডেট : ২৯ মে ২০১৮, ১০:২৭
সবটা মিলায়ে যা বোঝা গেল, এবার ঈদে দাপিয়ে বেড়াবে যে ফ্যাশনগুলো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে নজরে আসবে পোশাকের প্যাটার্ন, ফিটিংস, কাপড়ের আরাম ও প্রিন্টের বর্ণিল ক্যানভাস। এই কাঠফাটা রোদ তো এই বৃষ্টি, আবার ভ্যাপসা গরম। ঈদ এবার বর্ষার একেবারে শুরুর দিকে। বাজার ঘুরে দেখা গেল, ঈদের পোশাকে বৈচিত্র্যময় নকশার পাশাপাশি কাপড়ের বুনন ও রঙের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার বিষয়টিও মাথায় রেখেছেন ডিজাইনাররা। বেশির ভাগ পোশাকের ফেব্রিক সুতি ও লিনেন। পোশাকের রঙের ক্ষেত্রে ডিজাইনাররা হালকা শেডগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বর্ষার কারণে রঙের ক্ষেত্রে নীলের আধিপত্য থাকছে। এর পাশাপাশি আছে সবুজ, আসমানি ও ম্যাজেন্টার মতো রং। বডিফিটেড নয়; বরং লুজ ফিটেড পোশাকের প্রতি আগ্রহ যেন ক্রেতাদের। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ধারা ও কাঁচামালের প্রাপ্যতা—পরিকল্পনার আগে ফ্যাশন হাউসগুলোকে এসব নিয়েও ভাবতে হয়। জমকালো ও সাধারণ এই দুই মিলিয়ে ঈদের পোশাক বাছাই করা খানিকটা কঠিন। উত্সব, ভ্যাপসা গরম, সঙ্গে বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই পোশাকের ডিজাইন করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনাররা। বেছে নিয়েছেন জমকালো ও স্বস্তিদায়ক কাপড়।
 
পুরোনোকে বরণ করে নেওয়ার রেওয়াজটা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। পুরোনো ধাঁচ, সোনার মতো মূল্যবান কি না সেই সম্পর্কে যুক্তিতর্কের শেষ নেই। তবে এবারের ঈদ বাজার ও ফ্যাশন হাউসগুলোর ব্যস্ততা চলছে মূলত পুরোনোকে ফ্যাশনকে ঘিরেই। ঈদের ফ্যাশন ট্রেন্ড পূর্বের মতোই, তবে বৈচিত্র্য এসেছে প্যাটার্নে। আর আউটলুক বেশ গর্জাস ও সিম্পলিসিটি তো আছেই।
 
এবার যেহেতু বর্ষা ও গরমের মাঝামাঝিতে আসছে ঈদ, তাই সবার পছন্দের শীর্ষে রয়েছে সুতি ও সিল্কের তৈরি পোশাক। প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রাধান্য পাচ্ছে নীল, হালকা হলুদ, কমলা, বেগুনি, আকাশি, আসমানি, পেস্ট, সাদা, গোলাপি, সবুজ, ফিরোজা—এ ধরনের হালকা ও উজ্জ্বল রং। তবে উত্সবের পোশাক হিসেবে বর্ণিল রঙে হালকা কাজ তারুণ্যের পোশাক চাহিদায় থাকবে শীর্ষে।
 
উৎসবে লং প্যাটার্ন
 
ফ্যাশন ট্রেন্ডে এখন প্যাশ্চাত্য এবং দেশীয় মোটিফ উত্সবে যেন পায় দারুণ বৈচিত্র্য। তাই ঈদ ফ্যাশনে দেশি মোটিফের সঙ্গে চল এখন আন্তর্জাতিক মোটিফ, প্যাটার্ন ও কাটিংয়ের। চলতি কাটিং, প্যাটার্নের সঙ্গে রঙেও দেওয়া হয়েছে নজর। ঈদের পার্টি গাউনেও দেখা মিলবে এ ট্রেন্ডের। যেকোনো কামিজের প্যাটার্ন এবং কাটিং ডিজাইন করা হয় দুই অংশে। বডি ও বটম। এই ঈদে ড্রেসের বডিতে ভিন্নতা তেমন পরিলক্ষিত না হলেও বটম কাটিংয়ের নতুনত্ব চোখে পড়ে। এবারের ঈদে বটম ও বডির বৈচিত্র্য সমানভাবে দেখা যাবে। লং প্যাটার্নের পোশাক এবারও ঘুরে ফিরে বেশি নজরে আসবে। জেন্টল পার্কের ডিজাইনার শাহাদত্ চৌধুরি বাবু জানান, এবার উপমহাদেশীয় বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের পোশাকের কাট জনপ্রিয়তা পাবে। খানিকটা লং প্যাটার্নের পোশাকই এবার থাকবে ট্রেন্ডে ইন। জনপ্রিয়তা পাবে কাবুলি, গাউন স্টাইল কামিজ বা শেরওয়ানি কাটের পোশাকও।
 
এদিকে ক্যাটস আইয়ের ডিজাইনার-পরিচালক রুমায়লা সিদ্দিকী জানান, ঈদ হলেও ফ্যাশনে চলছে এখন গ্রীষ্মকালীন ডিজাইন। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনো চলছে লম্বা কাটিংয়ের কামিজ। কামিজ ডিজাইনে তাই এবারের ঈদে ঘুরেফিরে রয়ে গেছে লং প্যাটার্ন। পাশাপাশি চলতি কাটিং, প্যাটার্নের সঙ্গে রঙে দেওয়া হয়েছে নজর।
 
আরামদায়ক কাপড় আর ঢিলেঢালা কাট
 
ঈদ যেহেতু গরমের সময় তাই পোশাক হিসেবে এবার আরামদায়ক কাপড় আর ঢিলেঢালা কাটই বেশি ফোকাস ইন। এ সময় ফ্যাশন করতে পছন্দ করে এমন টিনেজরা ফিটিং টিউনিক টপস, কাফতান, স্টাইলিশ কুর্তা বেছে নিতে পারে অনায়াসেই। অন্যদিকে এসব পোশাকই আবার অনায়াসে মানিয়ে যাবে ৩০-এর কোটায় আছেন এমন নারীর সাথেও। তবে এক্ষেত্রে কাট ও নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে। ছোট কাফতান না পরে একটু লম্বা কাফতান বেছে নিলেই ভালো লাগবে। টপসের রং গাঢ় না হলেই মানিয়ে যাবে বয়স ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। আর ওভার সাইজ ফ্যাশন এখন তুঙ্গে, তাই অনায়াসেই ব্যবহার করতে পারেন একটু বেশি লেন্থের স্টেকাটার টপসও। এক লেয়ারের ফ্যাশন করতে গেলে অবশ্যই বটমটাও হতে হবে মানানসই। গরমে পরার জন্য সবচেয়ে মানানসই হবে নিট, সুতি ও লিলেন কাপড়ের তৈরি পোশাক। কেউ লেয়ারিং ফ্যাশন পছন্দ করলে ব্যবহার করতে পারেন টপস বা ইনারের ওপর হালকা একটি সামার জ্যাকেট। স্লিভলেস ছাড়াও এ সময়ে ম্যাগি হাতা এবং থ্রি-কোয়ার্টার হাতার পোশাকে লাগবে ফুরফুরে। তবে প্যাটার্ন ব্লোড এবং শরীরের সাথে মানানসই ফিটিংস হলে অবশ্যই তা স্মুদি এবং ফ্যাশনেবল হবে। গরমে গর্জিয়াস উপস্থাপনার জন্য সাধারণ কুর্তি বা টপসে ফ্রিল ব্যবহার বেশ চলবে। এদিকে টপসের দৈর্ঘ্য আগের তুলনায় বেড়েছে। দেশীয় উপাদানের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন কাট যুক্ত হয়েছে। আগে শর্ট টপসের প্রচলন বেশি থাকলেও এখন হাঁটু সমান বা তার থেকে লম্বা টপসের প্রচলন বেশি দেখা যায়। আবার ঢিলেঢালা টপস বা কুর্তার পাশাপাশি একটু চাপা ধরনের টপসের চাহিদাও রয়েছে।
 
ফিরে এসেছে ম্যান্ডারিন ভেস্ট
 
ইতিহাস বলছে, এক সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘জওহর কোট’। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরুর পরিধেয় বিশেষ ধরনের কোটটি একসময় চর্চার বিষয় ছিল। এখনো অনেক রাজনীতিবিদের গায়ে শোভা পায় সেই জওহর কোট। সেই পথেই ‘মোদি কোট’। শুধু রাজনীতিকরাই নন, আমজনতারও পছন্দের হয়ে ওঠে মোদির স্টাইল। পরবর্তীতে মোদি কুর্তা ছাড়া লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবির সঙ্গে মোদি কোট ঈদ ফ্যাশনেও বাংলাদেশে সাড়া ফেলে দেয়।
 
এবারের ঈদে তাই অনেকেই পাঞ্জাবির ওপর কটি চাপিয়ে লুকে ভিন্নতা আনতে চাইছে। তবে কেনার আগে জানার আছে পাঞ্জাবির ধারা এবার কোন দিকে? খাটো নাকি লম্বা? ঢিলে নাকি আঁটসাঁট! জানার আছে পাঞ্জাবিতে কোন রং এবার ফ্যাশনে বাজিমাত করবে, সে বিষয়টিও। ঈদ বাজার এরই মধ্যে গমগমে। ফ্যাশন হাউসে ঈদের পাঞ্জাবিও আসতে শুরু করেছে।
 
দোকানে যা এসেছে, আর যা আসার অপেক্ষায় আছে, সবটার খবর জানতেই শপিং মল ঘুরে দেখা। নানা শেডের নীল রং ব্যবহার করা হচ্ছে পাঞ্জাবিতে। কেন এবার নীল রং বেশি? এই প্রশ্নের উত্তরে ফ্যাশন হাউস ক্যাটস আইয়ের পরিচালক এবং ডিজাইনার সাদিক কুদ্দুসের ব্যাখ্যা হলো—এ বছর ঈদে আবহাওয়া মেঘলা থাকতে পারে। আর আমাদের দেশে বৃষ্টির সঙ্গে নীলের একটা গভীর যোগাযোগ আছে। তাই বলে শুধু নীল রং দিয়েই যে পাঞ্জাবির বাজার ছেয়ে আছে, তেমনটাও নয়।
 
সেটা অবশ্য সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে। পাঞ্জাবিতে আছে লাল, হলুদ, সবুজ, ছাই রং, জলপাই, বটল গ্রিন, বেগুনি ইত্যাদি রং। তবে গাঢ় রঙের চেয়ে প্রতিটা রঙের হালকা শেড বেশি দেখা যাচ্ছে এবার। তবে এবার পাঞ্জাবির ওপরে কটির ফ্যাশনটা ফিরে আসবে। এই ফ্যাশনের আমরা নাম দিয়েছি ম্যান্ডারিন ভেস্ট! ফ্লোরাল প্রিন্টের এবং বেশ গর্জাস এথনিক স্টাইল অনুসরণ করা হয়েছে এসব কোটগুলোয়।
 
এবার মোটামুটি চার ধরনের পাঞ্জাবি পাবেন বাজারে। যার মধ্যে আছে সাধারণ কাটের পাঞ্জাবি, মধ্যম ঝুলের (সেমি লং) পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি কাটের পাঞ্জাবি ও শরীরের সঙ্গে পুরো লেগে থাকে, এমন (বডি ফিটিং) পাঞ্জাবি। এর মধ্যে প্রথম ধরনটা বয়স্কদের জন্য। বাকি সব ধরনের পাঞ্জাবি তরুণ ও মাঝবয়সীদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। পাঞ্জাবির সঙ্গে কটি পরে ভিন্ন চেহারায় নিজেকে উপস্থাপন করেন অনেকে। তাই এবারও কটির চল থাকছে একইভাবে। বিশেষ করে ঈদের দিন দাওয়াতে গেলে এই কটি ভালো দেখাবে বলে জানাচ্ছেন ফ্যাশন ডিজাইনাররা।
 
মডেল : রিবা, আসিফ আজিম, ইন্দ্রিলা, রাব্বি ও আজিমুদৌল্লা
পোশাক : ক্যাটস আই
ছবি : সাঈদ সিদ্দিকী রুমি