ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা দাবি, ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট : ১০ জুন ২০১৮, ২০:৩৬
পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক ইন্সপেক্টর, এক এসআই, দুই এএসআইসহ মোট দশজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন মো. আমান নামে এক ব্যক্তি। রবিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালতে এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
 
অভিযোগে বলা হয়েছে, সদর উপজেলার ফতুল্লার ভোলাইল এলাকার গরুর খামারি জামাল হোসেনকে ডিবির কার্যালয়ে চারদিন আটকে রেখে চাহিদামত অর্থ আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে ডাকাত বানিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়। অভিযুক্ত করা হয়েছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরির্দশক (ইন্সপেক্টর) মো. গিয়াস উদ্দিন (বিপি নং ৬৭৮৫০২৯১৭৪), উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শহিদুল ইসলাম, সহকারি-উপপরিদর্শক (এএসআই) নাজিম উদ্দিন, মো. আমিনুল হক, কনস্টেবল মো. হাদিউজ্জামান (কং ৬৯৬), মো. ইব্রাহিম হোসেন (কং ৬৭৫), মো. আফাজউদ্দিন (কং ৭৬৩) ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সোর্স সদর উপজেলার মধ্য কাশিপুর এলাকার মজিবুল্লাহর ছেলে মো. মাহবুব, চর নরসিংপুর এলাকার মো. আলীর ছেলে মো. মিজানুর রহমান এবং ভোলাইল পশ্চিমপাড়া এলাকার জাহেদ আলীর ছেলে মো. সুমন আক্তার।
 
বাদীর পক্ষে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন অ্যাড. সাঈদুর রহমান (সাব্বির)। আদালত শুনানি শেষে বিকেল চারটার দিকে বাদীর আবেদনটি গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারকে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মর্যাদার অফিসারকে দিয়ে মামলাটি দ্রুত তদন্ত করিয়ে তা আদালতে দাখিল করতে। কোট পিটিশন মামলা নং ১২৩/১৮।
 
মামলার আবেদন থেকে আরও জানা গেছে, গত ২ জুন দুপুরে ২টার দিকে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) গিয়াসউদ্দিনের নেতৃত্বে গরুর খামারি জামাল হোসনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা বলে ধরে নিয়ে আসা হয়। এদিন রাত ৯টার দিকে জামাল হোসেনের ছোট ভাই মো. আমান জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কার্যালয়ে এলে ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিন পরের দিন সকালে আসতে বলেন। এবং কথামতো এদিন সকাল আটটার দিকে সে পুনরায় এলে ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিন তাঁর ভাইকে ছেড়ে দেয়ার শর্তে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। এ টাকা পেলে আটক জামালকে ছেড়ে দেয়া হবে বলা হয়।
 
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, গিয়াসউদ্দিনের চাহিদা মতো টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় হুমকি দিতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে ২ লাখ টাকা চুক্তি হয়। পরে ৩ জুন রাতে আমান ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আসে এবং তা প্রদান করে জামানকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু বাকি দেড় লাখ টাকা না পেলে ছাড়া যাবে না বলে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন গিয়াসউদ্দিন। পরবর্তীতে আমান হোসেন দেড় লাখ টাকা পরিশোধ করার জন্য ৪ জুন রাত ১০টা পর্যন্ত সময় চেয়ে নেন।
 
অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, ৪ জুন রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হাজতখানায় খামারি জামান হোসেনকে আহত অবস্থায় মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখেই কান্না ভেঙে পড়েন আমান। তিনি গিয়াসউদ্দিনের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন এবং জামান হোসেনকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় তাঁরা ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিনকে জানান, তাঁদের কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই। এ সময় কার্যালয়ের কর্তব্যরত অন্যরা আমানকে কার্যালয় থেকে বাইরে বের করে দেয়।
 
বাদী তাঁর আর্জিতে জানান, ডিবি কার্যালয় থেকে তাঁদেরকে বের করে দেয়ার সময় গিয়াসউদ্দিন হুমকি দিয়ে বলে, ৫ জুনের মধ্যে বাকি দেড় লাখ টাকা না দিলে জামানকে ক্রসফায়ার দেওয়া হবে। এ অবস্থায় আমান হোসেন ৫ জুন দেড় লাখ টাকা দেওয়ার জন্য সময় চেয়ে নেন। পরবর্তীতে ৫ জুন রাতে একজন আইনজীবিসহ ডিবি কার্যালয়ে পুনরায় উপস্থিত হন আমান। এ সময় আইনজীবি ডিবি ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিনের কাছে জানতে চান জামানকে কোন অপরাধে ২ তারিখ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছে? একই সঙ্গে তিনি বলেন, জামান যদি কোনো অপরাধ করে থাকে তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধি ৬১ ধারা মোতাবেক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আদালতে প্রেরণ কেন করা হয়নি? এ ঘটনায় তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ডিবি ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিন। পরের দিন ৬ জুন ফতুল্লা মডেল থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করে তাঁকে রিমান্ডে আনেন।
 
প্রসঙ্গত, ভোলাইল গেদ্দার বাজার এলাকার মৃত নূরুল ইসলামের ছেলে গরুর খামারি জামান হোসেনকে গত ২ জুন দুপুরে ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর গিয়াসউদ্দিনের নেতৃত্বে তাঁর খামার থেকে আটক করে নিয়ে আসা হয়। পরে চারদিন আটক রেখে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ৬ জুন বিকেলে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করে আদালতে প্রেরণ করেন এবং রিমান্ডে নিয়ে আসেন।
 
এ ঘটনায় জামান হোসেনের ছোট ভাই আমান হোসেন জেলা পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন।
 
ইত্তেফাক/নূহু