নিমতলায় আঞ্জু ফকীরের প্রতারণার শিকার নিরীহ মানুষ

আপডেট : ২১ জুন ২০১৮, ১৭:১৭

রাজবাড়ীর সদর উপজেলার শহীদ ওহাবপুর ইউনিয়নের নিমতলা গ্রামের রেললাইনের পাশে আঞ্জু বেগম বাবা লালন শাহের ধ্যানে বসে অর্ধশত রোগ নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। গ্রামাঞ্চলের নিরীহ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে ধোঁকা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। দশ টাকার চিকিৎসা প্রচারণা চললেও গোপনে চলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

দশ টাকার নজরানার চিকিৎসক আঞ্জু বেগম(৪০) রাজবাড়ী সদর উপজেলার শহীদ ওহাবপুর ইউনিয়নের নিমতলা গ্রামের মো. ইসলাম মোল্লার স্ত্রী। সপ্তাহের শনিবার ও বৃহস্পতিবার কয়েক শত রোগী রাজবাড়ী জেলাসহ পাশ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। অনেকেই পেয়েছে বাবার ধ্যানে দশ টাকার নিরাময়ী ওষুধ।
IMG0
আঞ্জু ফকীরের বাড়ি সরজমিন পরিদর্শন করা হয় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়। ফকীর লালন শাহের ছবি সংযুক্ত আসনের ধ্যানে বসার অপেক্ষায় ছিলেন তখন অর্ধশত রোগের চিকিৎসক আঞ্জু বেগম(৪০)। এদিকে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ভিড় জমিয়েছে চিকিৎসকের বাড়ির উঠানে। অন্যদিকে অর্ধশত পানে চুন, সুপারি ও জর্দা দিয়ে চিকিৎসকের খাবার তৈরি হয়ে গেছে। কখন বসবে ধ্যানে আঞ্জু বেগম এই নিয়ে আলোচনা শুরু হয় রোগীদের মাঝে, যেন অপেক্ষার শেষ নেই।

ছোট একটি টিনের একচালা ছাপড়া ঘর। ভিতরটা কাগজের ফুল, কাঠের তৈরি আসন, চিকিৎসক আঞ্জু বেগমের হুইল চেয়ার। পাশে খেজুর পাটিতে বসে রয়েছে রোগীরা। আঞ্জু বেগম আসলেন তার আসন ঘরে। পানের বাটা থেকে একটি পান মুখে পুড়ে নিয়ে বসলেন ধ্যানে। পাশে তার স্বামী ইসলাম মোল্লা(৫০) বসে আছেন রোগীদের জন্য ধ্যানে পাওয়া ওষুধ এগিয়ে দিতে। তার মেয়ে মায়ের (আঞ্জু) পায়ের পাশে বসে দশ টাকার নোটগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন।

রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রোগীরা রিক্সা, ভ্যান, অটোরিক্সাযোগে রাজবাড়ী জেলার সদর উপজেলা, গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, পাংশা, ফরিদপুর জেলার কোতুয়ালী, নগরকান্দা, মধুখালী, আলফাডাঙ্গা ও মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছে বাবার ধ্যানে আঞ্জু ফকিরের চিকিৎসা সেবা নিতে। ১০ টাকা হতে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে হার্ট, লিভার, ক্যান্সার, কিডনি সমস্যা, শ্বাস কষ্ট, ব্রেনের সমস্যা, স্বামী-স্ত্রীর গোপন রোগ, জাদু টোনা থেকে নিরাময়, ভুত-জ্বিনের আছর থেকে মুক্তি, মাথা, পেট, শরীর ব্যাথা সহ অর্ধশত রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ তালিকায় রয়েছে তাল মিসরী, চিনি, সরিষার তেল, গোলাপ জল, কালো মুরগির ডিম, কালিজিরা, মেথী, গবরের ছাই। যেমন রোগের ধরণ, তেমন চিকিৎসকের নজরানা। এ সকল ওষুধ আঞ্জু ফকিরের বাড়িতেই বিক্রি হয়।

ফরিদপুর জেলার কমরপুর থেকে সুফিয়া বেগম(৫০), কোতুয়ালী থানার জাহাঙ্গীর শেখ(৪৫), রাজবাড়ীর বহরপুরের জাহুরা বেগম, কামালদিয়া থেকে আ: রব, স্থানীয় ফরিদ মোল্লা, মরিয়ম  বেগম সহ একাধিক ব্যক্তি জানান, তাদের মধ্যে কেউ কেই দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ চিকিৎসা নিয়ে ভালো হওয়ায় তারাও মাঝে মধ্যে অনেক রোগী নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে কেউ আজই প্রথম এসেছেন অন্য কারো কাছে আঞ্জু ফকিরের চিকিৎসার কথা শুনে।

প্রতিবেদনের প্রতিবেদক নিজেও রোগী সেজে আঞ্জু ফকিরের কাছে গেলে কোন প্রকার সত্যতা ফুটিয়ে তুলতে পারেননি চিকিৎসক।

সচেতনমহল ও স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘ ৮/১০ বছর যাবৎ আঞ্জু ফকিরের বিভিন্ন আত্মীয়দের মধ্যে দিয়ে প্রচার ঘটিয়ে প্রতারণা করে চলছেন। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের মাসহারা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে ভণ্ডামি। এ ভণ্ডামির কারণে ভেঙ্গেছে অনেকের সাজানো সংসার। এমনকি থানায় মামলাও দায়ের হয়েছে।

আঞ্জু বেগম (৩৫) ও তার স্বামী মোঃ ইসলাম এর বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর নানান অভিযোগ রয়েছে। ইতিপূর্বে সে এই ভণ্ডামি ব্যবসা চালিয়ে মোটা দাম দিয়ে জমি কিনেছে বাড়ি তুলবে বলে। ১০ টাকা নিয়ে যদি চিকিৎসা করে আঞ্জু বেগম তাহলে এতো টাকা দিয়ে জমি কিনে ইট-বালি দিয়ে বাড়ি করার টাকার যোগান দিচ্ছে কে এমন প্রশ্ন জুড়ে দেয় এলাকাবাসী।

ইত্তেফাক/নূহু