রাসিকের পাড়া-মহল্লায় সোচ্চার কাউন্সিলর প্রার্থীরা

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৮, ১৯:৩৯
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) নির্বাচনকে ঘিরে আবারো জেগেছে কাউন্সিলর প্রার্থীরা। মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি নগরীর ওয়ার্ডের পাড়া-মহল্লায় এখন সোচ্চার কাউন্সিলর প্রার্থীরা। ইতিমধ্যে মহানগরীর ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে দুই শতাধিক প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
 
ধারণা করা হচ্ছে, এবার রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন থেকে চারশ প্রার্থী হতে পারে কাউন্সিলর পদে। তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরাই জাগিয়ে তুলেছেন পাড়া-মহল্লা। পুরাতনদের পাশাপাশি নতুনরাও আসছেন এ তালিকায়। আছেন বিতর্কিতরাও। সবমিলিয়ে রাজশাহী মহানগরীর ৪০টি ওয়ার্ডের অলিগলিতে প্রচারে নেমেছেন তারা। যোগাযোগ রাখছেন ভোটারদের সঙ্গে।
 
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপিপন্থী মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল নির্বাচিত হন। ওই সময় কাউন্সিলর পদেও সিংহভাগ নির্বাচিত হন বিএনপিপন্থীরা। তবে মেয়রের মতো নির্বাচিত কাউন্সিলররা গত ৫ বছর ছিলেন অন্তরালে। হাতেগোনা কয়েকজন কাউন্সিলর এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখলেও বেশির ভাগ কাউন্সিলরের টিকিও ছুতে পারেন নি নাগরিকরা। এবার তারাও নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। তারাও আবার ভোটারদের দারস্থ হচ্ছেন। আবারো দোয়া চাচ্ছেন, ভোট প্রার্থনা করছেন। তবে মহানগরবাসী নাখোস গতবারের নির্বাচিত বেশিরভাগ কাউন্সিলরের প্রতি।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত নির্বাচনে মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ২৫টি ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বিএনপিপন্থীরা। নির্বাচনের আগে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা মূলত কোনো কাজই করতে পারেনি গত ৫ বছরে। তবে হাতে গোনা কয়েকজন কাউন্সিলর ছিলেন সোচ্চার। তারা এলাকার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।
 
গত ৫ বছরে কাজের পরিবেশ ছিল না বলে দাবি করে বিএনপিপন্থী কাউন্সিলররা নিজেদের দায় এড়িয়ে গেলেও নগরবাসীর বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মহানগরবাসীর অভিযোগ, গত নির্বাচনে বিজয়ী কাউন্সিলররা এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসেন নি। গত ৫ বছরে সামান্য মশা মারা তো দূরের কথা তাদের দেখাও মেলে নি। অনেক কাউন্সিলরের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা মেলে নি দীর্ঘ সময়। ২০১৩ সালের পর থেকে নগর ভবনের মতো ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কার্যালয়গুলো ছিলো কাউন্সিলর শূন্য। কোনোমতে একজন সচিব চালিয়েছেন ওয়ার্ড অফিস। সেখান থেকে নাগরিক সেবা বলতে শুধুমাত্র নাগরিক সনদপত্র, জন্মনিবন্ধন কার্ড পেয়েছেন। এছাড়া নূন্যতম কোনো সেবা মিলেনি ৫ বছরে।
গতবার মহানগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন নিযামুল আজিম নিজাম। পরে মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের অনুপস্থিতিতে তিনি ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ সময়। তবে কাজের কাজ করেন নি নিজ ওয়ার্ডের। নগরীর মূলটাউন বলে পরিচিত ১২ নম্বর ওয়ার্ডে গতবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপিপন্থী ইকবাল হোসেন দিলদার। গত ৫ বছরে এলাবাবাসী তাকে খুজেই পায়নি। এ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সরিফুল ইসলাম বাবু। এবারো তিনি কাউন্সিলর প্রাথী হবেন।
বাবু জানান, বিগত নির্বাচনের পর থমকে যায় পুরো রাজশাহী মহানগরীর উন্নয়ন। মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল যেমন ছিলেন, তার সঙ্গে বিএনপিপন্থী কাউন্সিলররাও ছিলেন অযোগ্য। গত ৫ বছরে এলাকার কোনো উন্নয়ন করতে পারেনি। নিজের ওয়ার্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, টানা ৫ বছর এলাকাবাসী কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা পায়নি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে। তিনি বলেন, নাগরিকদের অনেকে তার কাছে অভিযোগ করেছেন, কাউন্সিলরকে তারা খুজেই পান নি।
 
রাজশাহী মহানগরীর ১৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিএনপি নেতা রবিউল আলম মিলু। তিনিও গত ৫ বছরে ছিলেন নিষ্ক্রিয়। তার মত নগরীর ২৫টির বেশি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে ভোটারদের অভিযোগ। এবারো তারা প্রার্থী হচ্ছেন। ইতিমধ্যে অনেকে মনোনয়নপত্র তুলেছেন।
এ অবস্থায় পুরনোদের পাল্লা দিয়ে এবার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নতুনদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। নতুন প্রার্থীরা বলছেন, গত ৫ বছরে রাজশাহীবাসী কাউন্সিলরদের কাছ থেকে কোনো সেবা পাননি। তাই তাদের আবার প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নেই। এ কারনে নতুনরা আসছেন।
অন্যদিকে রাজশাহী মহানগরীর হাতে গোনো কয়েকটি ওয়ার্ডের কাউন্সির বিগত নির্বাচনের পর থেকেই ছিলেন সক্রিয়। এরমধ্যে একজন নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরু এবং ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল হামিদ। উভয়ে এলাকায় নাগরিক সেবা দিয়েছেন। বিগত ৫ বছরে পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড গড়েছেন। সব ধরনের নাগরিক সেবাও পেয়েছেন ওয়ার্ডবাসী।
 
তারা বলেন, বিগত ৫ বছরে নানা প্রতিকুলতায় তাকে কাজ করতে হয়েছে। তবে এলাকার উন্নয়নে, নাগরিক সেবা প্রদানে একটুকুও পিছপা হননি। তার কার্যালয় নিয়মিত খোলা থাকে। নাগরিকরা আসেন। সমস্যা সমাধান করেন। নিজে দাড়িয়ে ড্রেন পরিস্কার করেছেন। মশা মারার ফগার চালিয়েছেন। তারা বলেন, জনগণের সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলে। তাই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। আগামীতেও করবেন।
 
সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের অবস্থাও ছিল একই। তারাও এলাকার উন্নয়নে কোনো অবদান রাখতে পারেন নি। নগরীর সংরক্ষিত ৫নং ওয়ার্ড সপুরা এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত ৫ বছরে সাধারণ কাউন্সিলকে তো পাওয়া যায় নি। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের দেখা মিলেনি। তবে এ ওয়ার্ডের বাসিন্দা এক চা দোকানি বলেন, এবার ঈদের আগের দিন সেমাই আর চিনি বিতরণ করেছেন এ ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর শামসুন্নাহার।
 
নগরীর সংরক্ষিত ৩ আসনের কাউন্সির মোসলেমা খাতুন বেলী জানান, তিনি পর পর দুইবারের কাউন্সিলর। বিএনপিপন্থী এ নারী কাউন্সিলর প্রথমবার ২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের আমলে এলাকার অনেক উন্নয়নমুলক কাজ করেন। পরবর্তিতে নির্বাচিত হয়ে মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের নেতৃত্বে এলাকার কোনো উন্নয়ন কাজই করতে পারেন নি।
তিনি বলেন, এলাকার উন্নয়নে সড়ক সংস্কার কাজের টেন্ডার হলেও ঠিকাদার কাজ করেন নি। কাজ করে টাকা পাবেন না এ ভয়ে ঠিকাদার কাজেই হাত দেননি। তবে এবার নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, আগামী ৩০ জুলাই রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। রাজশাহী সিটিতে এবারো সাধারণ ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩০টি। এছাড়া ১০টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডেও ভোট হচ্ছে। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৭টি। 
 
ইত্তেফাক/আরকেজি