একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে সিরাজগঞ্জ-৫ (চৌহালী, এনায়েতপুর,বেলকুচি) আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের মাঝে উৎকন্ঠা ততই বাড়ছে। কে পাচ্ছেন নৌকা ও ধানের শীষ এ নিয়ে সরগরম পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার সর্বত্র। উভয় দলেই তিনের অধিক প্রার্থী মনোনয়নে আশাবাদী থাকায় নিজেদের মধ্যে অন্তঃদ্বন্দ্ব বেশ জোরালো।
তবে এ অঞ্চলে জনপ্রিয়তায় দলবল নির্বিশেষে সাবেক মন্ত্রী, সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাস এগিয়ে থাকায় সেই এখন আলোচনায়। দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিমত, কর্মী ও উন্নয়ন দরদী লতিফ বিশ্বাস নৌকা মনোনয়ন পেলে নির্বাচনের হিসেব নিকেশ যাবে পাল্টে। এলাকায় নিজেদের ভোট ব্যাংক খ্যাত বিএনপিকে বেশ বেগ পেতে হবে ১০ বছর ধরে হারানো আসন ফিরে পেতে।
জানা যায়, উপমহাদেশের প্রখ্যাত ধর্মীয় নেতা, ওলিয়ে কামেল হযরত শাহসুফী খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ)-এর পুণ্যভূমি খ্যাত সিরাজগঞ্জ-৫ আসনটি থেকে প্রতি ৫ বছর অন্তর যে রাজনৈতিক দল বিজয়ী হয় তারাই ক্ষমতায় আসীন হন। বর্তমানে চৌহালী উপজেলার ৯২,৭৩৭ ও বেলকুচি উপজেলার ২,৩৬৯৭৫ ভোটারের এ সংসদীয় আসনে ১৩ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার এলাকাটি বিএনপি-জামায়াতের ঘাটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। তবে ২০০৮ সালে দেশের মধ্যে চরম প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মহজোট প্রার্থী আলহাজ্ব আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ১,১৯,৫৮২ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি নেতা ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী মেজর (অবঃ) মঞ্জুর কাদের ১,১৯,৩৩০ ভোট পান। এতে মহাজোট প্রার্থী ৪ দলীয় জোট প্রার্থীকে মাত্র ২৫২ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় লাভ করে। যা তখনকার ৩০০টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই।
এরপর আওয়ামীলীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লতিফ বিশ্বাসের প্রতি সন্তুুষ্ট হয়ে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেন। তখন এলাকার উন্নয়ন, অগ্রগতীতে নিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে এলাকা জুড়ে প্রশংসিত হন। তার নেতৃত্বে বিএনপি ও জাপার বলিষ্ঠ নেতারা দল ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। বাড়ে দলের সক্ষমতা।
তবে গত দশম জাতীয় সংসদ ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের হঠাৎ মনোননয় বঞ্চিত হন এই কর্মীবান্ধব নেতা। মনোনয়ন পান গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ মন্ডল। এ নিয়ে তৃণমুল আওয়ামী লীগে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তখন জেলার ৬টি আসনের মধ্যে ৫টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় হলেও এ আসনের ৩,০৩২৭৭ ভোটের নির্বাচনে সেদিন ৩৩ শতাংশ ৯২,৯৬৬ ভোট পেয়ে মজিদ মণ্ডল বিজয়ী হন। প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান রতন ৪,২৪৮ ভোট, জাপা প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক ২০৪৩ ভোট পান।
জনশ্রুতি রয়েছে বিজয়ী হবার পর থেকে তিনি জনকল্যানে যথাযথ ভুমিকা না রাখায় এখানে বিএনপির পাল্লাই ভারি। তবে কর্মী দরদী লতিফ বিশ্বাস জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হবার সুবাদে এলাকায় স্বামর্থ অনুযায়ী কর্মীদের মুল্যায়ন ও এলাকার সামগ্রীক উন্নয়নে ভুমিকা রাখছেন। দল ও কর্মীদের পুনরায় সুসংগঠিত করেছেন। জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে সাবেক এই ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, এমপি ও মন্ত্রী এবার আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট জোরালো মনোনয়ন প্রত্যাশী। এদিকে বর্তমান আওয়ামীলীগ এমপি ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ মন্ডল গত এক বছর আগেই নিজে প্রার্থী হবেন না বলে ছেলে এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুল মোমিন মণ্ডল দলের প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর থেকেই মোমিন মন্ডল মাঝে মাঝে এলাকায় এসে জনসংযোগ করছেন। এছাড়া এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ঢাকার বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মীর মোশারফ হোসেন তরুনদের নিয়ে মাঠে কাজ করছেন। তিনিও মনোনয়ন প্রাপ্তিতে বেশ আশাবাদী।
প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে চৌহালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব হজরত আলী মাষ্টার ও সদিয়াচাঁদপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব সিরাজুল আলম মাস্টার জানান, দলকে সু-সংগঠিত, কর্মীদের মুল্যায়ন এবং শেখ হাসিনার নির্দেশিত উন্নয়নের পথে যে সময় না দেবে এদের মত মানুষকে এমপি বানিয়ে লাভ নেই। বর্তমান এমপি এসব ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এক্ষেত্রে দলের ৮০ ভাগ জনগনের কাছে লতিফ বিশ্বাসই গ্রহনযোগ্য। এরপরই অবস্থান মীর মোশারফের। আর বাকিদের খবর নেই। তাই মনোনয়নে ভুল করলে তৃনমুলের নেতা-কর্মীরা কোন দায়ভার নেবে না।
এদিকে কৃষি ও তাঁত শিল্প নির্ভর এ আসন কৃষক ও তাঁতী সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। তাঁতী সম্প্রদায়ের সিংহভাগ বিএনপি ও জামায়াত ঘরনার। অতীত থেকেই নির্বাচনে তারা আওয়ামী বিরোধিতায় জোরালো ভুমিকা পালন করে আসছে।
সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির বর্তমান দুঃসময়ে এলাকার নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ জোড়ালো ভুমিকা পালন করছে ঢাকার আবাসন খাতের ব্যবসায়ী ও সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি তরুন জননেতা রাকিবুল করিম খান পাপ্পু। তার পাশাপাশি গত ২ দশক ধরে মাঠে কাজ করছে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম। মুলত তারা দুজন এ এলাকায় বিএনপির নিবেদিত কান্ডারী হিসেবে কাজ করছে।
এছাড়া সাবেক এমপি মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের, গোলাম মওলা খান বাবলু, চৌহালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারাও ধানের শীষ পেতে কাজ করছেন। এছাড়া জামায়াতের নেতা অধ্যক্ষ আলী আলম আসন থেকে প্রার্থী হবেন বলে তিনি প্রচারনা চালাচ্ছেন।
নির্বাচনের বিষয়ে একুশে ফোরাম সিরাজগঞ্জের সভাপতি আখতারুজ্জামান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক ডনু জানান, নির্বাচন হবে এবার চর্তুর মুখী। আশা করছি বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামাত স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবে। এককভাবে যদি এসব দল নির্বাচন করে তাহলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচন হবে হাড্ডাহাড্ডি।
এক্ষেত্রে উভয় দলকেই প্রার্থী বাছাইয়ে এবার যোগ্যতার প্রমান দিতে হবে। কারন লতিফ বিশ্বাস জনপ্রিয় আর হেভিওয়েট প্রার্থী। আওয়ামী লীগ যদি তাকে মনোয়ন দেয়, তাহলে সাধারন অনেক ভোটার দল ছেড়ে অনেকটা এক কাতারে আসে। তাই ধানের শীষের ভোটের আধিক্য থাকলেও বিএনপিকে প্রার্থী বাছাইয়ে এবার কঠিন ভুমিকা রাখতে হবে।
এদিকে আগামী সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এনায়েতপুর থানাকে উপজেলা বাস্তবায়ন, যমুনার ভাঙন রোধ, তাঁত শিল্পে গ্যাস সংযোগ প্রদান দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। জনগনের এসব দাবি বাস্তবায়নে যারা সহায়ক ভুমিকা পালন করবে তাকেই বিজয়ী করে সংসদে পাঠাবে ভোটাররা।
ইত্তেফাক/নূহু
