শেরপুরের ঝিনাইগাতী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এলাকা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসন ‘গজনী অবকাশ’ নামে গড়ে তোলেন একটি পিকনিক স্পট। বন্য হাতির আক্রমণে ফসলের ক্ষতি ও মানুষের প্রাণহানি হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের এক বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
এই অঞ্চলে সম্প্রতি চা চাষ করা শুরু হয়েছে। বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ক্ষেত্র তৈরির মাধ্যমে নতুন স্বপ্ন দেখছেন পাহাড়িরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল এ অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে। ঝিনাইগাতী উপজেলায় ১৮শ’ ৫৬ একর, নালিতাবাড়ী উপজেলায় ২৫শ’ একর ও শ্রীবরদী উপজেলায় ১১শ’ ৫১ একর জমি চা চাষের উপযোগী বলে ঘোষণা করে। কিন্ত প্রয়োজনীয় অর্থের জোগাড় না হওয়ায়, উদ্যোক্তা ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা গড়ে উঠেনি।
প্রায় ১৪ বছর পর এবার ‘গারো হিলস টি কোম্পানী’ নামে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ক্ষুদ্র চাষীদের মাধ্যমে ২৭ হাজার চা চারা রোপণ করে ২৭টি প্রদর্শনী বাগান করা হচ্ছে। চা চাষী মো. আহসান উল্ল্যাহ বলেন, ‘গারো পাহাড়ি এলাকায় ফনিক্স ভাই (কোম্পানীর চেয়ারম্যান) আমাদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইতিমধ্যে আমরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জানতে পেরেছি টহরুই বা কালোগোটা, কালোনেওয়া নামে এ দুই ধরনের গাছ যেসব মাটিতে জন্মায় সেসব মাটি চা চাষের উপযোগী। আমাদের পাহাড়ি এলাকায় এসব গাছ প্রচুর জন্মে। আশা করি আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন সত্যি হবে। ’
উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়নের চেয়ারম্যান মি. নবেশ খকসি বলেন, ‘গারো পাহাড়ে বন্যহাতির আক্রমণে ফসলাদি যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত। এজন্য এ এলাকার চাষী ভাইয়েরা ফসল ঘরে তুলতে পারে না। এ এলাকা চা চাষে উপযোগী তাই চা চাষ করতে চাষীরা ব্যাপক আগ্রহী।’
গারো হিলস টি কোম্পানীর চেয়ারম্যান মো. আমজাদ হোসাইন ফনিক্স বলেন, ‘এ অঞ্চলের মাটি চা চাষের জন্য উপযোগী। তারপরেও ১৪ বছর চলে গেছে। জমি, অর্থায়ন ও উদ্যোক্তার অভাব ছিল। আমরা উদ্যোক্তা হয়ে সরকারের সহযোগিতায় এ বিষয়গুলো সমাধান করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ’চা চাষের মাধ্যমে যে চা উৎপাদন হবে তা শেরপুর জেলা তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি গজনী পর্যটন কেন্দ্রের জন্য বড় অবদান রাখবে।’
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট’র (বিটিআরআই) সাবেক সহকারী অধ্যাপক এমএ খালেক জানান, ‘এ জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চা চাষাবাদের জন্য জমির মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার সময় আমি বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে ছিলাম। এখানকার মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থা চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে চা উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল মাহমুদ বলেন, ‘এক সময় চা চাষ সিলেটেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০০০ সালে পঞ্চগড়ে ও ২০০৫ সালে চট্টগামে চা চাষ শুরু হয়। এখানেও দীর্ঘ দিন গবেষণা ও চেষ্টা করা হচ্ছিল চা চাষের জন্য। আমরা যদি মাটির দিক থেকে চিন্তা করি এখানকার মাটি সিলেট-পঞ্চগড়ের মাটি মোটামুটি একই রকম। চা চাষে যে কান ধরনের সহযোগিতা লাগলে আমাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হবে।’
উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বাদশা বলেন, এ গারো পাহাড়ে চা চাষাবাদে যে উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন তার মাধ্যমে এ অঞ্চলের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটনেও আকৃষ্ট হবে। সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সাহায্যের অনুরোধ জানান তিনি।
ইত্তেফাক/এমওয়াই/নূহু
