বিকাশমান সড়ক অবকাঠামোর সদ্ব্যাবহার করে পিরোজপুরের উত্তরাঞ্চলের বৈঠাকাটা-বিশারকান্দি বিলে কমিউনিটি ও ইকোট্যুরিজমের এক অপার সম্ভাবনা ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। পিরোজপুরের নাজিরপুর, বরিশালের বানারিপাড়া ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলা সদরের সঙ্গে ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা এবং প্রক্রিয়াধীন সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এ সম্ভাবনাকে উজ্জল করে তুলেছে। এ বিলের মাঝে রয়েছে প্রকৃতির এক বিস্ময়, যাকে ঘিরে প্রতিভাত হয়েছে গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকার অনবদ্য প্রদর্শনী।
বিশ্ব কৃষি ঐতিহ্য বলে জাতিসংঘ স্বীকৃত ভাসমান শাকসব্জি চাষের একক ও বিস্তৃত জলাভূমির ব্যাতিক্রমী এ দর্শনীয় স্থানটি যেমন এখানে বিদ্যমান, তেমনি রয়েছে শীতকালীন নানা ফসলের আবাদ ‘কান্দি-বের’ পদ্ধতির ব্যাপক আয়োজনও। দেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার বৈঠাকাঠায় নৌকায় নৌকায় নদীতে বেচাকেনার দেখা মেলে শস্যদানা, শাকসব্জি, ফল-ফুলসহ রবি ও খরিপ মৌসুমের বাহারি কৃষিপণ্যের। এ বাণিজ্যিক সমাহার বছর জুড়ে, সব মৌসুমে প্রতি সপ্তাহে দুদিন শনি ও মঙ্গলবারে।
IMG0
বিশারকান্দির চৌমোহনী ও দেউলবাড়ি-দোবরার মনোহরপুরে ভাসমান বাজারের চিত্র বৈঠাকাটার সমতূল্য না হলেও কাছাকাছি। নদী-খাল-বিল-ডোবা-পুকুরে দেশী ও স্বাদু পানির নানা প্রজাতির মাছের উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় এখানকার প্রকৃতিঘন পরিবেশের কথা। নালা, খাল, নদীতে ছোট ছোট হ্জাারো যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক নৌকার ছন্দময় চলাচল অবাক করে নবাগত মাত্রকেই। বৈঠা হাতে নাও বেয়ে স্কুলগামী ছাত্র বৈ নয় ছাত্রীদেরও নৌপথ চলার বিরল দৃশ্য দেখতে চাইলে আসতে হবে বৃহত্তর বরিশালের এ একক বিল বৈঠাকাটা-বিশারকান্দিতে। যা একটি উন্নয়নমুখী গ্রামীণ জনপদের পরিচায়ক।
উদ্ভিদ ও জলজ জীব বৈচিত্রের প্রাচুর্য আর সবুজের অপরূপ সমাবেশ যে জনপদের নৈসর্গিক বৈশিষ্ট সেখানে পর্যটনের দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে সহজাত তাগিদেই-এ মন্তব্য করেছেন সুন্দরবন ভিত্তিক পর্যটন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘রূপান্তর ইকোট্যুরিজম’ এর পরিচালক নাজমুল আযম ডেভিড।
IMG1
তিনি বলেন, প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে, উৎসাহীজনের আগ্রহে বা গবেষণার প্রয়োজনে এ জলাভূমির আকর্ষণ আর নাম ছড়িয়ে পড়ছে দিনে দিনে। যা অনেককে প্রতিনিয়ত টেনে আনছে এ নিভৃতে। এসব মানুষ ইকোট্যুরিজমের মানসিকতা সম্পন্ন বলে তাদের এ মনোভাবকে কমিউনিটি ট্যুরিজমেও ডাইভার্ট করা সম্ভব। এলাকার শিক্ষিত তরুণদের গাইড হিসাবে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ী ঘরে কটেজ বানিয়ে পর্যটকদের আবাসিক সুবিধাও সৃষ্টি করা যায়।
খুলনার বিশিষ্ট পরিবেশ গবেষক রেজাউল হক খোকন বলেন, বৈঠাকাটা বিলাঞ্চলের জীববৈচিত্রের আধারকে বিশ্ব পরিমন্ডলে তুলে ধরতে এখানে পর্যটকদের আগমনকে অবারিত করতে হবে। ইউনেস্কো বাংলাদেশের জলাভূমির ভাসমান শাকসব্জি চাষকে যে বিশ্ব কৃষি ঐতিহ্য ভূক্ত ঘোষণা করেছে তার প্রধান ক্ষেত্র এই বৈঠাকাটা বিলে।
IMG2
ঢাকার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র সাতক্ষীরা ও পাবনার ছেলে জাহিদ আমিন সুশান্ত ও আশিক লিয়ন বৈঠাকাটা বিল ঘুরতে এসে এই প্রতিবেদকের কাছে এ বিলের ইকোট্যূরিজমের বিপুল সম্ভাবনার কথা বলেন। উপযুক্ত উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে স্থানীয় তরুণদের সহযোগিতায় বৈঠাকাটা বিলাঞ্চলে অচিরেই ইকোট্যুরিজমের বিকাশ ঘটবে। স্থানীয় কমিউনিটিকে সচেতন করে তুলতে পারলে এখানে পর্যটনের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জল।
এই দুই ছাত্র জ্যাকোপো প্যাসোট ও পল মাইলস সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের দুইজন পরিবেশ গবেষককে এ বিল দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন। এই দুই বিদেশী গবেষক এ বিলের জীববৈচিত্রের সমারোহ দেখে এই প্রতিবেদককে বলেন, এখানকার ভাসমান শাকসব্জি ও কান্দিবের পদ্ধতির চাষ বিশ্বের একটি বিরল কৃষি পদ্ধতি।
IMG3
এলাকার জীবন যাত্রার যে ব্যতিক্রমী অবস্থান তা দেখে এ বিদেশীরা মুগ্ধ হয়েছেন। সুযোগ পেলে তারা আবারও আসবেন। বিশেষ করে বৈঠাকাটা বাজারে নৌকার যে ভাসমান হাট তা বিশ্বে খুব কম জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়।
পর্যটনমনস্কতা বা গবেষণা ভাবনায় আগত মানুষ প্রধানত এখানে আসছে নৌপথেই, ঘুরছে-ফিরছে নৌযানে করে। বিলের মাঝে ঘুরতে-ফিরতে নৌযানের বিকল্পও নেই। পর্যটন সম্ভাবনার এ দুর্গম-দূরবর্তী এ বিলটিতে এক সময় আসতে নৌপথ ছাড়া যেমন গত্যন্তর ছিল না। তেমনি ছিল সময় সাপেক্ষ।
সম্প্রতি বিলাঞ্চলটি সরেজমিনে দেখা গেল, এখন সে অবস্থার উত্তরণ ঘটতে শুরু করেছে। বিলের উপকন্ঠে পৌঁছানো যাচ্ছে চার চাকার গাড়িতে করে।
বরিশালের বানারীপাড়া থেকে ফেরী পার হয়ে ২২ কিমি দীর্ঘ বাইশারী-মলুহার-বিশারকান্দি-চৌমোহনী সড়ক হালকা যানবাহন চলার উপযোগী এক বছর ধরে। এ রাস্তার ৬.৮ কিলোমিটার সড়ক বিভাগ নির্মিত ও পাঁকা। বাকি ১৫.২০ কি.মি. এলজিইডির। যার বেশিরভাগ হেরিংবোন (ইট বিছানো) হওয়ায় লেগুনা, ইজিবাইক ও মোটর সাইকেল, মিনি কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদি চলাচল করে।
অন্যদিকে এলজিইডির ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা সদর-বৈঠাকাটা বাজার সড়কটি ২০১৮ সালের আগষ্ট মাসের মধ্যে সরাসরি যানবাহন চলাচল উপযোগী করতে জোরেসোরে চলছে দীর্ঘা সেতু নির্মাণ। ৩৭ কোটি টাকা ব্যায়ের ৩৬০ মিটার দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণ কাজের অগ্রগতির হার ৯৫ শতাংশ বলে জানান, পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সুশান্ত রঞ্জন রায়।
এ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ জানান, এই সড়কটিতে এখন হালকা যানবাহন চলাচল করে। দীর্ঘা সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হতে তিন মাস সময়ও লাগবে না। তখন বাংলাদেশের যে কোন স্থান থেকে বৈঠাকাটা বাজারে আসা যাবে বিরতি ছাড়াই।
বানারীপাড়া উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান জানান, ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে জাইকার অর্থায়নে ২০১৩-২০১৬ সালে বাইশারী-মলুহার-বিশারকান্দি পর্যন্ত ১৪.৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হয়েছে। এ স্বল্প পথে ৯৫টি ব্রীজ-কালভার্ট নির্মিত হয় কোন খাল বন্ধ না করেই। এ নির্মাণ কাজ করার সময় এলাকার ইকোসিস্টেম অক্ষুন্ন রাখতে আমরা সচেষ্ট ছিলাম। এলাকাটির পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েই রাস্তাটি নির্মিত হয়।
IMG4
বানারীপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, হেরিংবোন হওয়ায় নতুন প্রকল্প নিয়ে কার্পেটিং করে ভারি যানবাহনের জন্য এ রাস্তাটি উন্নত করতে হবে। এ রাস্তা দিয়ে বিশারকান্দি ও বৈঠাকাটা বিলের শাকসব্জিসহ অন্যান্য কৃষি পণ্য পরিবহণ সহজ হবে।
তিনি আরও জানান, বিশারকান্দি চৌমূহনীতে ৪০৫ মিটার একটি সেতু নির্মাণ কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া হয়ে সড়ক পথে আসাও সুগম হবে। ঢাকা থেকে সুরম্য দ্বিতল যাত্রীবাহী বড় বড় লঞ্চ প্রতিদিন বৈঠাকাটা বাজারে আসা-যাওয়া করে। এ নৌযানে যেমন রাজধানী থেকে এ বিলাঞ্চলে পর্যটকরা আসতে পারেন তেমনি স্বরূপকাঠি, ইন্দুরহাট, বানারীপাড়া লঞ্চ ঘাটেও আগমন সহজ। যেখান থেকে সড়ক ও নৌপথে ভ্রমনেচ্ছুরা যেমন এখানে আসতে পারেন তেমনি বরিশাল ও পিরোজপুরের লঞ্চ সার্ভিসের সুবিধাও যাত্রীদের জন্য রয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
