ভারত থেকে সময়মতো নির্মাণ সামগ্রী না আসায় রূপসা নদীর ওপরে খুলনা-মোংলা রেলসেতুর নির্মাণ কাজের গতি হ্রাস পেয়েছে। যেখানে রেল লাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ৫০ শতাংশ; সেখানে এখন পর্যন্ত রেলসেতু নির্মাণের অগ্রগতি হয়েছে ৩৯ শতাংশ। ফলে দুই দফা সময় বাড়ানোর পরও ২০২০ সালের নির্ধারিত সময়ে রেলসেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই প্রকল্পের গতি ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে খুলনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলাকে রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করতে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার খুলনা-মোংলা রেললাইন। যার মধ্যে রূপসা নদীর ওপর রয়েছে ৫ দশমিক ১৩ কিলোমিটার রেলসেতু।
জানা যায়, ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর একনেকে খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটির অনুমোদন করা হয়। ২০১২ সালের নভেম্বর প্রকল্পের পরামর্শক হিসাবে নিয়োগ পায় ভারতের সিইজি নিপ্পন কোয়ি জেভি প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর রূপসা রেলসেতুর পাইলিংয়ের কাজের উদ্বোধন করা হয়।
গত বছরের জুন মাসে খুলনা—মোংলা রেলসেতুর প্রথম স্প্যান স্থাপন করা হয়। দৃশ্যমান হয় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প। কিন্তু গার্ডার জোড়া দেওয়ার নাট-বোল্টের অভাবে এর পরের আটমাসে মাত্র ৫টি স্প্যান বসানো সম্ভব হয়েছে। যদিও প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে ৫৫টি স্প্যান রয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।
খুলনা-মোংলা রেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রমজান আলী বলেন, ব্রিজ নির্মাণ মূল কাজের অগ্রগতি অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। রেলসেতু নির্মাণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার জন্য সময়মতো প্রকল্প সাইটে ব্রিজের গার্ডার স্থাপনের নাট-বোল্ট ভারত থেকে না আসাকে দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রকল্প সাইটে আট মাস আগে ২২টি গার্ডার এসে পৌঁছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় নাট-বোল্ট এসে পৌঁছায়নি। ফলে গার্ডার স্থাপন সম্ভব হয়নি। তবে আশাব্যঞ্জক হচ্ছে, এই সময়ের ভেতরে ভারতীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘লারসেন অ্যান্ড টুব্র’ নদীর পাড়ের ভায়াডাক্ট অংশে পাইলিংয়ের কাজ এগিয়ে নিয়েছে। এছাড়া রূপসা নদীর দুই তীরের ৮৫৫টি পাইলিংয়ের মধ্যে ৮৫০টি পাইলিংয়ের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে বাকি আছে মাত্র পাঁচটি পাইলিং। ভারতীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্র’র প্রকল্প ম্যানেজার অম্রিতোষ কুমার ঝাঁ বলেন, পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে খুলনা-মোংলা রেল লাইন প্রকল্পের রূপসা রেলসেতু নির্মাণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান হয়নি। তিনি জানান, ভারতীয় অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের ৬৫ ভাগ মালামালও ভারতে তৈরি করা হচ্ছে। ফলে কাস্টমস জটিলতার কারণে মালামাল ছাড়াতে তিন মাসের বেশি সময় লাগছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকল্পের অগ্রগতিতে।
রূপসা রেলসেতু প্রকল্পের প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, রেলসেতুতে ১৪৬টি স্প্যান স্থাপন করতে হবে। ইতোমধ্যেই প্রকল্প এলাকায় ৫৫টি স্প্যান এসে পৌঁছেছে। আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যে ভারতে তৈরি হওয়া সকল স্প্যান প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছাবে। তিনি জানান, সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন রূপসা নদীর ভেতরে পাইলিং স্থাপন করা। নদীর মধ্যে ৭২টি পাইলিংয়ের প্রয়োজন হবে। পদ্মাসেতুতেও এই পাইলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। আগামী মে মাসে ভারতের চেন্নাই থেকে নদীর মধ্যে পাইলিংয়ের জন্য বিশেষায়িত ভারী যন্ত্রপাতি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তখনই শুরু হবে সেতু নির্মাণের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত। এটি সম্পন্ন হলে মোংলা বন্দরে আরো গতি সঞ্চার হবে। এটি মোংলা বন্দরের সঙ্গে খুলনাসহ সমগ্র বাংলাদেশের রেলসংযোগ তৈরি করবে। খুলনার জেলা প্রশাসক হেলাল হোসেন বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এই প্রকল্পের প্রতিবেদন প্রতিনিয়ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। যাতে যথাসময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়।
