বরেন্দ্র অঞ্চলে শেষ সময়ে এসে বোরো ধানে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। পোকা ক্ষেতের বোরোর শীষ কেটে দেয়ায় সেগুলো সাদা ও চিটা হয়ে যাচ্ছে। সব ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোন ফল পাচ্ছে না কৃষক। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
আলাপে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা জানান, মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধান কাটা মাড়াই শুরু হবে। এমন সময় হঠাৎ করে গত দুই-তিন দিনের মধ্যে পুরো মাঠে এক সঙ্গে পোকার আক্রমণ দেখা দেয়ায় হতাশায় পড়েছেন তারা। বাজারে সব ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাজ হচ্ছে না বলে জানান তারা।
এদিকে পোকার আক্রমণকে আবহাওয়া অনুকুল না থাকার বিষয়কে দুষেই দায় সারছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা। কৃষি কর্মকর্তরা বলছেন, চলতি মাসে প্রায় প্রতিদিন মেঘলা আকাশ, দিনে তাপমাত্রা বেশি, রাতে শীত থাকায় এসব পোকার আক্রমণ বেশি হচ্ছে। তবে সঠিক ভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করলে তা সেরে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে ৬৫ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দাম ভালো না থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর (প্রায় ৩৭ হাজার বিঘা) বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এবারে ৭০ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবঞ্জ জেলার আবাদ হচ্ছে আরো সাড়ে তিন লাখ হেক্টর জমিতে।
তানোর উপজেলার বাধাইড় গ্রামের কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, তিনি চলতি বছর ৮ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করেছেন। শুরু থেকে ধান ভালোই ছিল। এখন ৮০ ভাগ ধানের শীষ বের হয়েছে। এরই মধ্যে হঠাৎ করে তার ক্ষেতে শীষ সাদা হয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোন ফল পাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
তিনি আরো জানান, শুধু আমার ক্ষেতেই নয়, পুরো মাঠে একই সাথে অবস্থা হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কসবা ইউপির কাজলা গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, তার ৫ বিঘা বোরো ক্ষেতে প্রায় ১০ ভাগ ধান কেটে দিয়েছে মাজরা পোকা। এতে করে ক্ষেতের শীষ চিটা হয়েগেছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোন প্রতিকার মিলছে না।
কৃষকরা বলেন, রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার মাঠে এখন আগাম লাগানো বোরো ক্ষেতের কোনটিতে শীষে পাক ধরতে শুরু করেছে। আবার কোনটিতে শীষ বেরুচ্ছে। তবে সবে মাত্র শীষ বেরুচ্ছে এমন ক্ষেতে বেশি শীষ সাদা চিটা হয়ে থাকতে দেখা গেছে।
এরমধ্যে তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল এবং নওগাঁর মান্দা, পোরশা উপজেলার মাঠে বেশি মাজরা পোকার কাটা সাদা শীষ বেশি দেখা যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এসব এলাকার কৃষকেরা বলেন, তারা চলতি বছর বিভিন্ন জাতের বোরো আবাদ হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রিধান-২৮, ২৯, ৪৯, ৫০, ৫২, ৬২, বিআর-১৫, ১৬ এবং কিছু জমিতে হাইব্রিড। তবে যে জমিতে এখনও ৭০, ৮০, ভাগ শীষ বের হয়েছে সে ক্ষেতে মাজরা পোকার আক্রমণ বেশি। তবে ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ বেরুনো ক্ষেতে পোকা আক্রমণ বেশি করতে পারেনি বলে জানান তারা।
তানোর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শমশের আলী বলেন, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকুলই ছিল। সে ক্ষেত্রে মাঠে বোরো ধান ভালই হয়েছিল। তবে শেষ সময়ে এসে আবহাওয়া প্রায় প্রতিদিন মেঘলা, রাতে শীত ও দিনে তামাত্রা বেশি এমন কারণেই পোকার আক্রমণ হচ্ছে। তবে এ সময়ে মাজরা পোকা বেশি ক্ষতি করতে পারবে না বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, প্রতি নিয়ত আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সচেতনমূলক প্রচারণা চালাচ্ছি, লিফলেট বিতারণ এমন কি পোকা আক্রমণ থেকে বাঁচতে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলা সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, শেষ সময়ে এসে কিছু ক্ষেতে মাজরার উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে বেশি ক্ষতি করতে পারবে না কৃষকেরা সচেতন হলে। নিয়মমত ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করলে ঠিক হয়ে যাবে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
