কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গরুর গাড়ি

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:২৮
‘এক সময় হামারঘে দিগে (এলাকায়) ভাল দুটা বল (বলদ) ও একখানটা (একটা) গরুর গাড়ি থাকলে গৃহস্থালি চালাইতে আর কুনু চিন্তা করতে হতোকনা। এ্যার পর বিহা (বিয়ে) লিয়া গেলে মজা কইরা য্যামন খ্যাতে (খেতে) প্যাতুং তেমন বকশিশ হিসাবে টাকাও প্যাতুং (পেতাম)। এখন এগল্যা কিছুই ন্যায়। ঘাঁটা (রাস্তা) পাকা হয়্যা গেছে, টেরাকে (ট্রাকে) আর বাসে সব ক্যালিছে।’
 
কথাগুলো বলছিলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নধীন পারচৌকা গ্রামের ৭৫ বছর বয়স্ক পুরনো গাড়িয়ান মহসিন আলী। শুধু গাড়িয়ান মহসিনই নয়, তার ভাই চাঁদু (৮৫), রাঘববাটির চাঁন মুন্সীসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পুরোনো গাড়িয়ানদের সঙ্গে কথা বলে একই রকম ভাষ্য পাওয়া যায়।
 
গ্রাম বাংলার প্রাচীন যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে এক সময় প্রধান অবলম্বন হিসেবে গরুর গাড়ি ব্যবহার হতো। মানুষ যখন পশুকে যোগাযোগের মাধ্যমে হিসাবে ব্যবহার করতে শিখলো তখন গরুর গাড়িই যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি বিয়ের অতিথিদের ক্ষেত্রেও গরুর গাড়ির কোন বিকল্প ছিল না। তাই গরুর গাড়ি একটা ঐতিহ্যের অংশও বটে।
 
প্রাচীন ইতিহাসের ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জে গরু-মহিষের গাড়ির প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই। অভিজাত পরিবারের সদস্যরা গরুর গাড়িকেই যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতো। আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যেত গরুর গাড়ি চড়েই। এক সময় এ উপজেলার যেকোনো গ্রামেই চোখে পড়তো গরু কিংবা মহিষের গাড়ি। কিন্তু এখন যন্ত্রচালিত যানবাহনের কারণে সেই দৃশ্য খুব একটা আর চোখে পড়ে না।
 
এক সময় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটারের রাস্তা পাড়ি দিয়ে কৃষকেরা জমি চাষাবাদ এবং মালামাল বহনের জন্য এটি ব্যবহার করতো। আধুনিক যুগে পাওয়ার টিলার আসার কারণে গরু দিয়ে চাষাবাদ যেমন হয় না, ঠিক তেমনি গরুর গাড়ির কাজও পাওয়ার টিলার দিয়ে করা হয়। কালের বিবর্তনে এই গরুর গাড়ি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে।
 
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ও লোকজ সাংস্কৃতিক গবেষক ড.মাঝহারুল ইসলাম তরু বলেন, গরুর গাড়ি একটি স্বাস্থ্যসম্মত যানবাহন। এখানে বায়ু দূষণ ও সড়ক দুর্ঘটনার তেমন কোন সুযোগ নেই, কিন্তু দুঃখের বিষয় গরুর গাড়ির ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 
 
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার আমিনুজ্জামান জানান, দ্রুতগতির যানবাহন থাকায় হওয়ায় গরুর গাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। 
 
আদিনা ফজলুল হক কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক জিয়াউল হক বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য সমাজে ধরে রাখার জন্য বাৎসরিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গরুর গাড়ির ব্যবহার থাকা উচিৎ।  
 
বিনোদপুর ডিগ্রি কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক সফিকুল ইসলামের মতে, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর সঙ্গে গরুর গাড়ির পরিচিতি তুলে ধরা উচিৎ।
 
ইত্তেফাক/জেডএইচ