রেজাউল হক কৌশিক
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের নতুন নতুন সেবা দিতে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এগিয়ে রয়েছে। এটিএম, পস সেবার পর বর্তমানে অ্যাপভিত্তিক সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। একজন গ্রাহক যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থান থেকে নিজেই নিজের হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) মাধ্যমে লেনদেন করতে পারছেন। তাই এ ব্যাংকিং এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ব্যাংকিং একদিকে যেমন নিরাপদ অন্যদিকে তেমনই সহজ। ফলে বাড়তি সময় ব্যয় না করে অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং করছেন অনেকেই।
জানা গেছে, সিটি ব্যাংক সিটি টাচ নামে ইস্টার্ন ব্যাংক ইবিএল স্কাই ব্যাংকিং নামে, মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংক এমটিবি স্মার্ট ব্যাংকিং নামে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এসসি মোবাইল ব্যাংকিং নামে অ্যাপ ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক মোবাইল, ইসলামী ব্যাংক আইবিবিএল আইস্মার্ট, ব্যাংক এশিয়া স্মার্ট অ্যাপ, ইউসিবি ইউপে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এফএসআইবিএল ক্লাউড ব্যাংকিং, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এসআইবিএল নাউ নামে তাদের গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা গুগলের প্লে স্টোর ও আইফোনের অ্যাপ স্টোর থেকে এসব অ্যাপস ডাউনলোড করে ব্যাংকের সহযোগিতায় লেনদেনসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
এখন এসব অ্যাপের মাধ্যমে যেসব সেবা পাওয়া যায় সেগুলো হলো, অ্যাকাউন্ট সামারি অর ভিউইং অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স, ফান্ড ট্রান্সফার, চেকবুকস ও ইন্টারেস্ট ইকোয়ারিজ, বিল পেমেন্ট (গ্যাস, বিদ্যুত্, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট প্রভৃতি), ইনস্ট্যান্ট বিল পেমেন্ট (টিউশন ফি, মোবাইল ফোন বিল, ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম, ক্লাব পেমেন্ট), ট্রানজেকশন রিমাইন্ডার্স/নোটিফিকেশন, ভিউ ট্রানজেকশন ডিটেইলস। এছাড়াও ডিপোজিড-লোনস-কার্ড ম্যানেজমেন্ট, প্রিন্ট অ্যাকাউন্ট স্টেইটমেন্ট, পেয়ি ম্যানেজমেন্ট, ডিটেইল প্রোডাক্ট লিস্ট অ্যান্ড প্রোডাক্ট ইনফরমেশন, এয়ার টিকেটস পারচেজ, বিল পেমেন্ট ফর এনি ভিসা, মাস্টার কার্ড অর অ্যামেক্স ক্রেডিট কার্ড, ট্রান্সফারিং মানি টু ভিসা ডেবিট কার্ড, মোবাইল ফোন রিচার্জ প্রভৃতি সেবা পাওয়া যায় অ্যাপভিত্তিক এ ব্যাংকিংয়ে।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৬২ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করা এসব গ্রাহকের অনেকেই ইন্টারনেট ভিত্তিক লেনদেনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কারণ, ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানো কিংবা যানজট ঠেলে ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। ঘরে কিংবা অফিসে বসেই লেনদেন করা যায়। কেনাকাটাতেও নগদ টাকার পরিবর্তে ইলেকট্রনিক পেমেন্টের সুযোগ নিচ্ছে মানুষ।
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি’র চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন ব্যাংকে যেতে চান না। তারা তাদের ব্যবহূত মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ফান্ড ট্রান্সফার করে দেন। বর্তমানে মানুষ ঝামেলাবিহীনভাবে বিল পরিশোধের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। এতে খরচ, সময় উভয় বাঁচে।
দি সিটি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেন, সিটি ব্যাংকের ১৫ শতাংশ গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যাংকিং করে। সময়ের পরিবর্তনে এটা আরো বাড়বে। তিনি বলেন, ব্যাংকের শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। আবার গ্রাহকদের বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকে যেতে পরিবহন খরচসহ নানান ঝামেলা পোহাতে হয়। সে হিসাবে ক্যাশলেস ট্রানজেকশনে বিল বেশি মনে হলেও সুবিধা বেশি।
ঝামেলাবিহীন ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ২৯ হাজার ৩৬১টি লেনদেনের বিপরীতে ৬৩ কোটি টাকা পরিশোধ হয়েছে আন্তঃব্যাংক ইন্টারনেট ব্যাংকিং চ্যানেলে।
নিরাপত্তা ও ব্যাংকের চাপ কমানোর কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাপভিত্তিক ও ইন্টারনেট ভিত্তিক লেনদেনে গ্রাহকদের আগ্রহী করছে। এজন্য সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রচারণাও চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ব্যাংকগুলোতেও যদি অ্যাপভিত্তিক লেনদেন বাড়ে তাহলে শাখায় লেনদেনের চাপ কমবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তি ভিত্তিক সেবা দেওয়ায় গ্রাহক সন্তুষ্টিও বাড়বে। ধীরে ধীরে তা ক্যাশলেস সোসাইটির দিকে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
ইন্টারনেট ভিত্তিক লেনদেন সুবিধাজনক হলেও এতে কিছু ঝুঁকি আছে। ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
