নগরীতে চলাচলরত আলফা-মাহিন্দ্র ও অটো রিকশা চালকদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে যাত্রীরা। এসব যানবাহনের অধিকাংশই বিআরটিএ’র লাইসেন্স প্রাপ্ত হওয়ায় সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ২০০৮ সালে প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন মেয়র নির্বাচিত হয়ে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক নগরীতে চলাচলের লাইসেন্স প্রদান করেন। প্রথম ধাপেই বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে ১২শ’ ৯০টি ইজিবাইকের লাইসেন্স দেয়া হয় এবং পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৬শ’১০টিতে দাঁড়ায়। এ ইজিবাইক নগরীতে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তত্কালীন মেয়র ভাড়া নির্ধারন করে বিভিন্ন এলাকায় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। এই ভাড়ায় কয়েক বছর নগরবাসী চলাচল করতে পারলেও বর্তমানে বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রাপ্ত যানবাহনের কোনো ভাড়া নির্ধারন করা নেই।
২০১৩ সাল থেকে সিটি করপোরেশন কর্তৃক লাইসেন্স প্রাপ্ত ইজিবাইক আদালতের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী চলাচলে বাধা দেয় মেট্রোপলিটন পুলিশ। এরপরই বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রাপ্ত আলফা-মাহিন্দ্র ও সিলিন্ডার ভর্তি গ্যাস চালিত অটোরিকশা চলাচল করায় শুরু হয় যাত্রী জিম্মি। আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিসিসি’র সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএ’র এখানকার কর্মকর্তারা। বার বার বিসিসি’র মেয়র আহসান হাবিব কামালের সাথে মেট্রোপলিটন পুলিশ ও বিআরটিএ’র উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে নস্ফিল বৈঠক হয়। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাকৃত ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক চালকদের আন্দোলনের মুখে নগরীর মূল ২/৩টি সড়ক ব্যতি রেখে চলাচল করতে বলে মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এরই মধ্যে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি নগরীতে দ্রুত গতির আলফা-মাহিন্দ্র ও গ্যাস চালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেয়। ঐ কমিটির অনুমতি নিয়ে নগরীতে চলাচল শুরু করে ১০ হাজার গ্যাস ও ব্যাটারিচালিত অটোসহ আলফা-মাহিন্দ্র।
সিটি করপোরেশনের ইজিবাইক নগরীর অলিগলিতে চলাচল শুরু করায় এবং মূল সড়কগুলোতে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ও বিআরটিএ’র লাইসেন্স প্রাপ্ত যানবাহন চলাচল শুরুর পর থেকেই ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়। ব্যাটারী ও গ্যাস চালিত অটোরিকশা কিংবা আলফা মাহিন্দ্র চালকরা যে যার মতো ভাড়া আদায় করতে থাকে যাত্রীদের কাছ থেকে। দ্রুত গতির এ যানবাহনগুলোতে ৪ জন বসতে পারলেও ঠাসাঠাসি করে ৮ যাত্রী পরিবহন করা হয়। ৮ যাত্রী পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এসব যানবাহন ছাড়ে না। বাধ্য হয়ে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিয়ে ও ঠাসাঠাসি করে যাতায়াত করে। যাত্রীরা কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ঐ বাহন থেকে নেমে যেতে বাধ্য কিংবা ৮ জনের ভাড়া দিয়ে একা যাত্রী হতে বলা হয়। এসব যানবাহনের মালিক বা শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে প্রভাবশালী লোকজন জড়িত থাকায় সাধারন যাত্রীরা প্রতিবাদ করে উল্টো হামলার শিকার হয়।
সাধারন যাত্রীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, পূর্বে নগরীর রূপাতলী বাস টার্মিনাল থেকে লঞ্চঘাট কিংবা সদর রোডের কাকলির মোড় আসার পথে ১০ টাকার স্থলে ৫ টাকা দিলেই হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব যানবাহনে উঠলেই পুরো ভাড়া দিতে হয়। অনুরূপ অভিযোগ নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে সদর রোড কিংবা লঞ্চ ঘাট এলাকায় যাতায়াতকারীদের। তারপরও প্রতিটি এলাকায় রাস্তার দূরত্ব, যানজট, গরম, ও বৃষ্টির উপর নির্ভর করে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে পিছিয়ে নেই পায়ে চালিত রিকশা ও ব্যাটারি চালিত রিকশাও। রাতে সকল প্রকার যানবাহনের ভাড়া দিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সবচেয়ে দুরবস্থা হাসপাতাল ও আদালত পাড়া এলাকায়। এসব স্থানে যেসব যানবাহন প্রতিনিয়ত বসে থাকে তারা সিন্ডিকেট করে ভাড়া নির্ধারন করে। কেউই দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ার কমে যাতায়াত করে না। লঞ্চ ও বাসস্টেশন থেকে যেসব রিকশা ও অটো রিকশা যাত্রী পরিবহন করে তারা ১০ টাকা ভাড়ার পরিবর্তে ৫০ থেকে ৮০টাকা পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করে।
যাত্রীরা জানায়, নিয়মনীতি না থাকায় যানবাহন ভাড়া কোনো কারণ ছাড়াই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা বলেন, নগরীতে রিকশা ভাড়ার ক্ষেত্রে নিয়মনীতি তৈরি করা দরকার। এ বিষয়ে একাধিক আলফা-মাহিন্দ্র ও অটো রিকশা কিংবা রিকশা চালক জানান, কোনো সঠিক নিয়ম না থাকায় তারা নিজেরাই ভাড়া নির্ধারন করে নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের যানবাহন শাখার কর্মকর্তারা জানান, সিটি এলাকার সড়কের কথা মাথায় রেখেই সিটি করপোরেশন ২৬শ’১০টি ব্যাটারী চালিত ইজিবাইকের লাইসেন্স দিয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনকে পাশ কাটিয়ে বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগ ইচ্ছে মাফিক গণপরিবহন সীমিত সংখ্যক সড়কে পরিচালিত করায় নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। ঐ কমিটির সভাপতি মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও সদস্য সচিব বিআরটিএ’র এখানকার উপ-পরিচালক। বিসিসি’র কর্মকর্তারা জানান, সদ্য অনুষ্ঠিত বিসিসি’র নির্বাচনে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হলেও শপথ গ্রহন হয়নি। তাই বর্তমান মেয়রের শেষ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে যানবাহন শাখা কিছুই করতে পারবে না। তারা বলেন, নতুন মেয়র দায়িত্ব নিলেই এসব সমস্যার সমাধান হবে।
ইত্তেফাক/নূহু
