সীমান্তে হাতের নাগালে মাদক, নেশায় আসক্ত কিশোর-যুবকেরা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৩১
উখিয়া সীমান্তের পূর্বাঞ্চলীয় জনপদ রেজু আমতলী, গর্জবনিয়া, ডেইলপাড়া, করইবনিয়া ও হাতিমোরা এলাকায় পাচারকারী সিন্ডিকেটের প্রায় শতাধিক সহযোগীর মাধ্যমে ওপার থেকে আসছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সিগারেট, পলিথিন ও মাদকদ্রব্যের চালান।
 
মাঝে মধ্যে উখিয়া থানা ও হাইওয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে চোরাই পণ্য সামগ্রী আটক করলেও চোরাচালানীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এতে করে পাচারকারী সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দাবি করে গ্রামবাসী। 
 
তারা জানান, সীমান্ত এলাকাস্থ গ্রামগুলো এখন মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হাতের নাগালে মাদক বেচা-কেনার ফলে মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এতে উঠতি বয়সী বিভিন্ন শ্রেণি পেশার ছেলে মেয়েরা মাদকের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফলে সামাজিক জীবনে নেমে এসেছে নানা সমস্যা। অভিভাবকরা এনিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। 
 
সীমান্তের ডেইলপাড়া গ্রামে বসবাসরত আমির হোসন, সাইফুল ইসলাম ও মোহাম্মদ ইসহাকসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, পূর্বাঞ্চলীয় জনপদে প্রায় ১৫ সদস্যের চোরাচালান সিন্ডিকেটের শতাধিক সহযোগী পাচারকারী সীমান্তের ওপার থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত মালামাল এপারে নিয়ে আসছে প্রতিনিয়ত। এসব চোরাই পণ্যের মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের তৈরি ১২% নামের এক প্রকার তরল মাদক দ্রব্য ও ইয়াবা। এসব মাদকের চালান বিভিন্ন এলাকায় পাচার হওয়ার পরেও স্থানীয়ভাবে বেচাকেনা হওয়ার কারণে গ্রামের সহজ সরল কিশোর-যুবক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। নেশায় অভ্যস্ত এসব কিশোর যুবকেরা মাদকের টাকা যোগান দিতে গিয়ে বাড়ির মূল্যবান মালামাল চুরি করছে। এতে বাঁধা দিলে মা-বাবাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 
 
সম্প্রতি থানায় অভিযোগ করতে আসা হাতিমোরা গ্রামের আয়েশা খাতুন (৫৫) ও ভালুকিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আলী মাস্টার জানান, হাতের নাগালে মাদক বিক্রির কারণে স্কুল পড়ুয়া ছেলেরা মাদক সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। নেশার টাকার জন্য চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে। এসব কাজে বাধা দিলেও কোন কাজ হচ্ছে না। 
 
তারা তাদের মাদকাসক্ত অবাধ্য সন্তানের জন্য থানায় অভিযোগ করতে এসে সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা পত্রিকায় লিখুন, যাতে সরকার ও প্রশাসন মাদক প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। 
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসী জানান, স্থানীয় সাবেক ও বর্তমান ২/৩ জন জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় প্রতিরাতেই মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসছে ইয়াবা, পলিথিন, সিগারেট, গবাদি পশুসহ বিভিন্ন প্রকার নিষিদ্ধ ঘোষিত চোরাইপণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে ইয়াবা ও ১২% মাদক স্থানীয়ভাবে বিক্রি হওয়ায় এলাকার যুব সমাজ ও স্কুল কলেজগামী কিশোর যুবকেরা নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ালেখা বাদ দিয়ে অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে দাবি করে গ্রামবাসী মাদকের ছোবল থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। 
 
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা রাজাপালং ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাশেল উদ্দিন সুজন অভিযোগ করে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমতলী হয়ে টাইপালং সড়ক দিয়ে সিএনজি ভর্তি মিয়ানমারের চোরাইপণ্য উখিয়া সদরে নিয়ে আসা হচ্ছে, তাও আবার দিনের বেলায়। পুলিশ ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা রোহিঙ্গা নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগে চোরাচালানী চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠছে। 
 
পূর্বাঞ্চলীয় মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট এটিএম রশিদ জানান, চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধে জনমত গঠে তোলার লক্ষ্যে সভা সমাবেশ করা সত্ত্বেও চোরাচালান সিন্ডিকেটের তৎপরতা কমেনি। তাদের বেপরোয়া হয়ে উঠার নেপথ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে বলে ওই নেতা দাবি করেন। 
 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে উখিয়া থানার অফিসার ইনর্চাজ মো. আবুল খায়ের জানান, স্থানীয় গ্রামবাসী অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে পুলিশের একার পক্ষে চোরাচালান, মাদক পাচার ও মাদক সেবন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। 
 
তিনি মাদক প্রতিরোধের ব্যাপারে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তাতে চোরাচালান ও মাদক পাচার বিগত দিনের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে।
 
ইত্তেফাক/জেডএইচ