সমুদ্রবিধৌত, পাহাড়বেষ্টিত সবুজ আচ্ছাদিত চট্টগ্রাম মহানগরী আর আগের মতো নেই। ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন, দালানকোঠা অবকাঠামো নির্মাণের ব্যাপক কর্মযজ্ঞের মুখে চট্টগ্রাম মহানগরী গত কয়েক দশকে হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ গাছপালা। একটি গাছ কাটলে দশটি গাছ লাগানোর প্রেরণাদায়ক শ্লোগান শুনেছেন সবাই, কিন্তু পাত্তা দেননি। ফলে এককালের মনোমুগ্ধকর চট্টগ্রাম মহানগরীর সবুজ নৈসর্গিক শোভা লোপ পেয়ে পুরো নগরী ধূসর রঙ ধারণ করেছে। গত প্রায় তিন দশকে আবাসন ও অন্যান্য কর্মযজ্ঞের কারণে পাহাড়ও ধ্বংস হয়েছে অনেক। পাহাড় গেছে, সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের গায়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো সবুজ বুনো গাছপালা এবং লতাগুল্মের মনোমুগ্ধকর ঝোপঝাড়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক দশকে নগরীতে ঘর-বাড়ির আশেপাশে এবং নানা স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সবুজ গাছপালা এবং উদ্যানসমূহ জ্যামিতিকহারে ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু নতুন করে গড়ে ওঠেনি হারিয়ে যাওয়া সেইসব গাছপালার সম-পরিমাণ সবুজ উদ্যান। নগরীতে উদ্বেগজনকহারে গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যকর নগরজীবন এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। নগরীতে ধূলোবালি বাড়ছে, মাটির আর্দ্রতা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এমনকি পর্যাপ্ত গাছপালার অভাবে নগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞদের অনেকে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সকল মহলের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা সর্বাংশে দায়ী বলে তাদের অভিমত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কামরুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর বর্তমান আয়তন অনুসারে এখানে যে পরিমাণ গাছপালা থাকার কথা সে পরিমাণ গাছপালা নেই। যে পরিমাণ আছে তাকে বলা যাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অর্ধেকের চেয়েও কম। নগরীতে ভবন, দালানকোঠা নির্মাণের সময় গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। এই অবস্থাটা চলছে সরকারি খাস জমি, ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জায়গাগুলোতে। স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় ‘ভেজিটেশন কাভার’ বা সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা অনেক কমে গেছে। তার পরিবর্তে নগরীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলাকায় উঠেছে বড় বড় দালানকোঠা। তিনি বলেন, একটি স্বাস্থ্যকর পরিকল্পিত মহানগরীর কথা যদি বলা হয়, তবে বলতে হবে দালানকোঠা, ঘর-বাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামোর পাশাপাশি তাতে ২৫ শতাংশ ভেজিটেশন কাভার থাকতে হবে। তার মানে গাছপালা, উদ্যান ও সবুজ বৃক্ষ-গুল্মাদির পরিমাণ ঐটুকু থাকতে হবে। সেই সঙ্গে একটি বড় ভবনের আশেপাশে রাখতে হবে একটি খেলার মাঠ, সবুজ উদ্যান, জলাশয় ইত্যাদি। ওইটুকু না থাকলে ঐ শহর বা নগরী বাসযোগ্য হবে না।
অধ্যাপক কামরুল হুদা আরো বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর রেলের প্রধান কার্যালয়, পাহাড়তলী, মতিঝর্ণা, জয় পাহাড়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের পূর্ব পাশে, ময়লার ডিপোর পাশে প্রচুর পরিমাণে সবুজ গাছপালা ছিল। মেডিক্যালের পাশে অধুনা আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে গিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। ময়লার ডিপোর পাশেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে।
বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাদার্ন ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য প্রকৌশলী আলী আশরাফ ইত্তেফাককে বলেন, নগরীতে যেসব গাছপালা কাটা হচ্ছে তার অনেকটাই হচ্ছে বলা যায় অসচেতনভাবে। গাছপালার সম্প্রসারণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক বাড়ানো যায়। একটি গাছ কাটলে ১০টি লাগানোর যে তাগিদ তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া নগরীর আশেপাশের যেসব পাহাড়ি এলাকা রয়েছে, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো লতাগুল্ম ও বুনো গাছ অনেকটা সবুজের অভাব পূরণ করে। তবে নগর এলাকায় যতো বেশি গাছ থাকবে পরিবেশও ততো ভালো থাকবে। তিনি বলেন, সারা দেশে এখন বনাঞ্চল থাকার হার সাত থেকে আট শতাংশ বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সূত্রের অভিমত। কিন্তু থাকা দরকার ছিলো ২১ থেকে ২২ শতাংশ।
চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরিফ চৌহান ইত্তেফাককে বলেন, নগরীতে গাছপালার অভাব এখন ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে যতো দ্রুত সম্ভব সবাইকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু সরকারের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে চলবে না। নাগরিকদের নাগরিক দায়-দায়িত্বেরও একটা বিষয় রয়েছে। এ ব্যাপারে নগরীর পরিবেশ যাতে সুরক্ষিত হয় তার সকল শর্ত যত্নের সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্যও তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।
ইত্তেফাক/আরকেজি
