সে এক অন্ধকার রাত্রি ছিল। অন্ধকারের সঙ্গে প্রেতিনীর রূপকথা। রূপকথাকেও হার মানায়।
এসব কিভাবে হয় তনুর জানা ছিল না। বোধের জগতে যতক্ষণ পারে জেগেছিল পশুদের পাশবিকতাকে বাধা দিতে। চোখ ছিল বাঁধা, হাত দুটো পিছমোড়া। তাই তার চোখে মধ্যগগনের সূর্য কেবলই গ্রহণ লাগা। সাপেদের মুখে এত বিষ থাকে তাই বা সে জানবে কী করে? তার চোখে পৃথিবীর শেষ দৃশ্য শিক্ষাগুরু শিল্পপ্রিয় পুরুষের নুরের জ্যোতি শত জিহ্বায় অতর্কিতে লালসার বমন। বুকের নগরীতে আগুন জ্বলা হুংকার।
শেষ চৈত্রের খর মধ্যাহ্নে উতল হাওয়া দেহলতা থেকে আবরণ খুলে উড়িয়ে দেয় নিরুদ্দেশে—একা দাঁড়িয়ে থাকে স্খলিতবসনা। শিয়রে শমন শিকলের মতো বাজে। মৃতকুসুমের বনে তনুর শরীরদর্পণ ভেঙে টুকরো টুকরো হতে থাকে। স্মৃতি-বিস্মৃতির স্বপ্নগুলো নগ্ন হতে হতে সে হয় কলঙ্কিনী।
এবার কলঙ্কিনীকে তো সমাজে রাখা চলে না। ভয় আছে অপবিত্রতার। সমাজ শুদ্ধির বয়ান চলে ধর্মশালা থেকে দিগম্বর দিগন্ত পর্যন্ত। পাপ-পুণ্যের বাহাসও চলে নিরাপত্তার ঘেরটোপে। কী হিংস্র রণদামামা। পাপীর পাপ ছাপিয়ে ওঠে শ্যাওলা পচা উগ্র গন্ধ। সে জলজ গন্ধে চাপা পড়ে যায় অন্য সবকিছু। মহাকালীর সংকেত—কলঙ্কিনীকে আগুনে পোড়াও। তনুর উরুর মাংস পোড়া গন্ধ সরল বাতাসে সমাজ প্রবল পতন থেকে রক্ষা পাবে। বাতাসে শবের গন্ধ পুরুষ সভ্যতার ইচ্ছেকে উসকে দেয় অলজ্জ আত্মশ্লাঘা। আজানুলম্বিত নগ্নপ্রশ্ন মরুভূমিতে কেন তারা মেয়েশিশুকে মাটি চাপা দিত? নিশ্চয়ই সে ছিল নির্বোধের পরিচয়। তাকে ভোগ করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলাই শ্রেয়।
তনুর পোড়া মাংসের গন্ধ বাতাসে মিশে গেছে সেই যে রাতে মোটা কাচের জানালায় নাক ঘষটে বৃষ্টি ঝরা, ফোঁটায় ফোঁটায় জল জমা গাছের পাতারা ক্লান্ত অথচ চাপা ভাপ ওঠা তাপ বেরিয়ে আসছিল তার মাটি চাপা কণ্ঠ থেকে।—প্রবঞ্চক শান্তির ছায়াবীথিকা থেকে বেরিয়ে এসো যোদ্ধাবালিকার মতো। হাতে তুলে নাও রক্ষাকবজ। নইলে কেবলই নিশ্চিহ্ন হতে থাকবে। জাগো, জাগিয়ে তোলো চারদিক। তোমার জন্যে কোনো কবিতা নয়, গদ্যের বর্মে মুড়ে নাও শরীর।
বাইরে কালবৈশাখীর মত্ত হাওয়ায় বালিকদের দীর্ঘনিশ্বাসে আকাশ ঘন কালো হয়ে আসছে!
