জালিয়ানওয়ালাবাগের অমোচনীয় ক্ষত

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৫৭

নাদিরা মজুমদার

 দেখতে দেখতে শতবর্ষ হয়ে গেল। গত তেরোই এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শতর্বষ পূর্তি হলো। ১৯১৯ সালের এই তারিখে ব্রিটিশ-ভারত সেনাবাহিনীর ট্রুপ নিরস্ত্র শিশু-নারী-পুরুষের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। সম্পন্ন হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে। জালিয়ানওয়ালাবাগের কুখ্যাত এই হত্যাকাণ্ডটি ‘অমৃতসর হত্যাকাণ্ড’ নামেও পরিচিত।

ব্রিটিশরাজের হিসেব মতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা তিনশো ঊনআশি, স্থানীয় হিসেব অনুযায়ী এক হাজারের অধিক। হতাহতের সংখ্যাও অনেক। এই বর্বরতার আবহ ছিল এরকম—প্রলম্বিত প্রথম মহাযুদ্ধের খেসারত হিসেবে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসন ও স্থানীয় রাজারা বিপুল খাদ্য ও বিশাল অঙ্কের অর্থকড়ি, গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্রের জোগান দেয়। সেইসঙ্গে লাখে লাখে ব্রিটিশ ভারতীয় সৈনিক ও শ্রমিকরা ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে উপনিবেশিক-প্রভুর সেবায় নিয়োজিত থাকে। হাজারে হাজারে মানুষ দেশ ছেড়ে সুদূর কোনো দেশে যাচ্ছে যুদ্ধ করতে কিংবা শ্রম দিতে, কিন্তু ফিরে আর আসে না। ফলস্বরূপ, অর্থকড়ির ও জনশক্তির ক্ষতির বিচারে ব্রিটিশ ভারতের জনগণের জীবনযাত্রা অসহনীয় হতে থাকে। যুদ্ধে হতাহতের প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চহারের কর, যুদ্ধজনিত কারণে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাহত হওয়া ইত্যাদিসহ, ১৯১৮ সালে গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে ‘স্প্যানিশ ফু।’

যুদ্ধের দ্বিতীয় বছরে, অর্থাত্ ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের জনগণকে আয়ত্তে রাখার জন্য ব্রিটিশ-রাজ যে ‘ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ চালু করে, যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে এই আইনটিকেই সম্প্রসারিত করে জজ সিডনি রাউলাটের নামানুসারে নামকরণ করা হয় ‘রাউলাট আইন’। ‘রাউলাট আইন’ বলে জনসাধারণের নাগরিক অধিকারগুলো হরণ করা হয়। যেমন : অবাধ্য অসামরিক ব্যক্তিকে বিচারবিহীন অবস্থায় জেলে পুরে রাখা। রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ভাইস রয়’কে চিঠি লেখেন যে, ‘অতএব, আমি, আইনটি পাসের বিরুদ্ধে এবং যে পদ্ধতিতে আইনটি পাস হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ বোম্বের আসন থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছি। ... (কারণ) যে সরকার শান্তিকালীন  এমন আইন পাস করে বা নিষেধাজ্ঞা আরোপে পিছপা হয় না, সেই সরকার সভ্যসরকার হিসেবে পরিচিতির যোগ্যতা হারায়।’ এবং গান্ধিজীর ক্ষেত্রে রাউলাট আইন হয় তাঁর অসহযোগ আন্দোলনের প্রেরণা।

ছয় কি সাত একর জমি নিয়ে, চারদিকে দেয়াল ঘেরা জালিয়ানওয়ালাবাগ পাবলিক বাগান হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। খুব কাছেই রয়েছে শিখদের ‘স্বর্ণ মন্দির / গোল্ডেন টেমপল’। প্রতিবছর তেরোই এপ্রিল, হিন্দু, মুসলিম, শিখ নির্বিশেষে অসামরিক শিশু-নারী-পুরুষরা ‘বৈশাখী’ উত্সবের জন্য জমায়েত হয় (‘বৈশাখী’ হলো উত্তর ভারতের ফসল কাটা ও ঘরে তোলার উত্সব)।  ১৯১৯ সালের তেরোই এপ্রিল, দুপুরের পর পর, পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ-ভারতীয় অসামরিক শিশু নারী পুরুষরা জমায়েত হয়। ‘বৈশাখী’ উত্সব ছাড়াও এবারের এজেন্ডায় থাকে সত্যপাল ও সাইফউদ্দিন কিচলু নামক দুই জাতীয় নেতার গ্রেফতার ও নির্বাসনে প্রেরণের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। দশ থেকে বিশ হাজার নিরস্ত্র অসামরিক মানুষের জমায়েতকে বানচাল করতে গুর্খা, শিখ ও সিন্ড রাইফেলসসহ (অস্থায়ী) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারকে পাঠানো হয়। কর্নেল ডায়ার অবশ্য ঝুঁকি এড়াতে যত্নবান ছিলেন। সঙ্গে মেশিনগান সজ্জিত দুটো সামরিক গাড়ি আনতে ভোলেননি। বাগের প্রবেশপথ সরু হওয়াতে ভেতরে আনা যায়নি বটে তবে বাগের যে একটিমাত্র প্রবেশ / নির্গমন পথ খোলা ছিল—গাড়িদুটোকে সেখানে রাখা হয়, পাহারায় থাকে অস্ত্রধারী সৈনিকরা। ডায়ার অতঃপর নিরস্ত্র অসামরিক জমায়েতকে ছত্রভঙ্গ হয়ে সরে পড়ার কোনো সতর্কবাণী উচ্চারণ ব্যতিরেকেই সরাসরি ‘কাজে’ নেমে পড়েন। যেদিকে জমায়েত বেশি ছিল, সেই অংশের প্রতি তিনি তার সেনাদলকে গুলিবর্ষণের হুকুম দেন। প্রায় মিনিট দশেক ধরে বিরামহীন একতরফা গুলিবর্ষণ চলে। অতঃপর এই সময়ের মধ্যে গোলাবারুদের সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ার দরুন (ষোলো শো রাউন্ডের অধিক) গুলিবর্ষণ থেমে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে ডায়ার গর্ব করে বলেছিলেন যে, ‘গুলিবর্ষণ করেন জমায়েতকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য নয়, বরং অবাধ্য ভারতীয়দের আচ্ছামতো আক্কেল দেওয়ার জন্য’।

ইংল্যান্ডে জালিয়ানওয়ালাবাগের বর্বরতার প্রতিক্রিয়া ছিল নানা মেজাজের। ইংলিশ হাউস অব লর্ডস ডায়ারের পিঠ চাপড়ে প্রশংসা করে, কিন্তু হাউজ অব কমন্স নিন্দায় মুখর হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ভারতে জন্মগ্রহণ করা ইংরেজ কথাসাহিত্যিক রুডিয়ার্ড কিপলিং আবার ‘ভারতকে রক্ষা করার জন্য’ ডায়ারের পঞ্চমুখ তারিফে মেতে ওঠেন। তত্কালীন যুদ্ধমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল হত্যাকাণ্ডকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলেন বটে কিন্তু ট্রাফালগার স্কোয়ারের তুলনায় মিনিয়েচার বলতে ভোলেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হার্বার্ট অ্যাসকুইথ বলেন ‘আমাদের সমগ্র ইতিহাসের একটি চরম নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।’

এই বর্বরতার সংবাদ রবীন্দ্রনাথকে ভীষণভাবে বিচলিত করেছিল এবং তিনি ‘নাইটহুড’ পরিত্যাগ করেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত সাহিত্যসেবী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রবীন্দ্রনাথের দর্শন কামনা করেন এবং কবিকণ্ঠে ‘নাইটহুড’ পরিত্যাগ ও অস্বীকার করার চিঠিটি শুনতে চান। ত্রিবেদীর অনুরোধ রক্ষা করতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষশয্যার পাশে গিয়েছিলেন এবং নিজে প্রতিবাদ বার্তাটি পড়েও শুনিয়েছিলেন, যেখানে লেখেন যে, ‘এহেন গণ-হত্যাকারীর কাউকে কোনো খেতাব/উপাধি প্রদানের যোগ্যতা নেই।’ 

কিন্তু এই গণহত্যার জন্য কি কখনো প্রকাশ্য দুঃখজ্ঞাপন করে ক্ষমাপ্রার্থনা করা হয়েছে? না। বরং মারমুখো মেজাজে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে ভারত ভ্রমণকালে রানি এলিজাবেথ ঘটনাস্থলে ফুলের তোড়া অর্পণ করেছিলেন। ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডেভিড ক্যামেরন জালিয়ানওয়ালাবাগে যান এবং বর্বরতাকে ‘গভীর লজ্জাজনক’ বলে থেমে যান। ক্ষমা চাইতে কুণ্ঠিত থাকেন। সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হাল আমলের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেও ‘যা ঘটেছে এবং যে দুঃখকষ্ট পেতে হয়েছে সেটি দুঃখজনক’ বলে থেমে গেছেন। তারা কেউ আর একশো বছরের পুরনো ঘটনার জন্য প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমাটমা চাওয়ার গুরুত্ব দেখছেন না। অথচ এখনো ইউরোপের সাবেক সাম্রাজ্যগুলোর পূর্বেকার উপনিবেশগুলোর অনেকস্থানেই অসামরিক নিরীহ জনগোষ্ঠী বোমাবর্ষণে, ড্রোনের আঘাতে, গ্রেনেড, মাইনের আঘাতে মারা যাচ্ছে। ভাবা যায়?

n লেখক : ইউরোপ-প্রবাসী সাংবাদিক

[email protected]