তরুণরা আগামীর প্রাণশক্তি। আর এই তরুণদের নিয়ে তাঁর ইতিবাচক চিন্তাগুলোর বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই গড়ে তোলেন রাজনৈতিক দল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা এনডিএম। যার সঙ্গে যুক্ত সিংহভাগই বয়সে তরুণ, তারাই সংগঠনটির এগিয়ে যাওয়ার পথে ভূমিকা রাখছে। আর এই স্বপ্নচারী মানুষটি হলেন ববি হাজ্জাজ। একজন শিক্ষক বা ব্যবসায়ী পরিচয় ছাপিয়ে আদর্শিক জায়গা থেকে তিনি তরুণদের ছুঁতে পেরেছেন বহুগুণে। আমাদের এবারের আয়োজনে কথা বলেছেন এনডিএম-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন রিয়াদ খন্দকার
বেড়ে ওঠার গল্পটি যেমন
১৯৭৮ সালে আমি ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে আমার শিক্ষাজীবন শুরু। সেখান থেকেই ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করি। এখনো ভালো ছাত্র হিসেবে স্কুলবোর্ডে নাম লেখা আছে। ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞান, ফিজিক্স, কসমোলজির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। মনে আছে, নিউ মার্কেটে জিনাত বুকস্টোর নামে একটা দোকানে এসব বিষয়ের বই পাওয়া যেত। নিয়মিত কিনতাম বলে দোকানের লোকেরাও চিনতেন। একবার বই কিনতে গেছি, তারা বললেন, আপনাকে দেওয়ার মতো কোনো বই বাকি নেই!
বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই ফিজিক্স বেছে নিলাম। ভর্তি হলাম যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে। পড়াশোনা শুরুর দেড় বছর পর ফিজিক্সে আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। তখন ভাবলাম, এই বিষয় নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনায় মন দিলে আমার হয়তো আর দেশে ফেরাই হবে না। ফিজিক্সের মতো বিষয়ে নিয়ে পড়াশোনা করলে ক্যালটেক বা এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে গেলে কাজে লাগবে, কিন্তু আমার দেশের কী কাজে লাগবে। গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে গেলে দেশেই ফিরতে পারব না। এরপর বিষয় বদলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বেছে নিই। পড়াশোনা শেষে ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে পরিচিত কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছি। এরপর কিছুদিনের ছুটি নিয়ে অক্সফোর্ডে গেলাম মাস্টার্স করতে। সেখানেই আমার স্ত্রীর রাশনা ইমামের সাথে পরিচয়। ২০০৯ সালে একসাথে দেশে ফিরে আমার স্ত্রী আইন পেশা নিয়োজিত হলেন আর আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হলাম এবং কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করলাম। এর পাশাপাশি একটা ইংরেজি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতাম। এই কাজগুলো করতে করতেই ২০১২ সালে রাজনীতিতে সরাসরি জড়িয়ে গেলাম।
রাজনৈতিক জীবনে সম্পৃক্ততা
রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়েছি চল্লিশ বছর বয়সে। মূলত এই সম্পৃক্ততা গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে। এর আগে পরোক্ষভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। সেসময় বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছি। রাজনৈতিক দলেরও উপদেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলাম। এই হিসেবে ১৯৯৬ সাল থেকে আমি রাজনীতির সঙ্গে আছি। কিন্তু ২০১২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন তাঁর সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান, তখন থেকেই প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে আসা।
যে রাজনীতিবিদদের অনুসরণ করেন
সিমন বলিভার, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সিমন বলিভার উত্তর আমেরিকাকে স্বাধীন করার নায়ক। গান্ধী ভারত থেকে সাম্রাজ্যবাদীদের হটিয়েছেন। আর বঙ্গবন্ধু তো বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এ দেশকে স্বাধীন করলেন। যা বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয়।
IMG0
এগিয়ে চলায় অনুপ্রেরণা যোগান যারা
সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে। আমার বাবা-মা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা। আমার বাবা (মুসা বিন শমসের) ভিন্ন কাজ করেছেন, কিন্তু এর মাধ্যমেই তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন। প্রেরণার তালিকায় আমার স্ত্রীও (ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম) আছেন। তিনি আমাকে সবসময় স্পৃহা জোগান সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
তরুণেরা কী রাজনীতিবিমুখ
রাজনীতির প্রতি তরুণদের বিরূপ ধারণা আছে এটা সত্যি। কারণ দেশের যুবসমাজকে রাজনীতি সম্পর্কে সবসময় ভুল বোঝানো হয়েছে। গত একবছরে তিনটা বড় আন্দোলনে তরুণরা রাস্তায় নামল। এসব আন্দোলনের মানে হলো সরকার তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না কিংবা তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতি দেখতে পাচ্ছে না। অথচ এই ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমে কী বলে? রাজনীতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে বলে রাজনীতি দূরে রাখো। অথচ তারা জানেই না যে দাবি নিয়ে তারা রাস্তায় নেমেছে—এটাই রাজনীতি। কোনো পলিসি চেঞ্জের লক্ষ্যে জনগণের সম্পৃক্ততাই রাজনীতি। যুবসমাজকে বোঝাতে হবে তারা রাজনীতির মধ্যমণি। আর এসব আন্দোলনের মাধ্যমেই তো শেখ মুজিব, গান্ধীরা তৈরি হয়েছেন। অনেক সময় দেখি, খাবারের দোকানের দেয়ালে লেখা, ‘রাজনৈতিক আলাপ চলবে না’ বা সাইনবোর্ডে লেখা থাকে ‘অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’ অথচ এই ধারণাটাই ভুল। রাজনীতির বাইরে কোনো কিছুই নেই, সবই রাজনীতির অংশ। শুধু নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর সমর্থন করা বা তাদের নিয়ে কথা বলাই রাজনীতি নয়।
সঠিক রাজনীতি শেখার উপায়
রাজনীতি শেখানোর কোনো স্কুল হয় না। তবে পাবলিক পলিসি বা লোকপ্রশাসনে পড়াশোনা করে রাজনীতিকে বোঝা যায়। তবে একাডেমিক পড়াশোনা বাদে রাজনীতি শিক্ষার গুরু দায়িত্ব নেওয়া উচিত দলগুলোর। যেমন আমার দলের কর্মীদের জন্য লেকচার সেশন আছে। আমরা পার্টি অফিসে লেকচার সেশন করি। বিভিন্ন ভিডিও দেখাই। গণতন্ত্র কী হওয়া উচিত, সেটা বোঝাই। পাশাপাশি আমি মনে করি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান-রাজনীতি এগুলো বেসিক জিনিস। সবধরনের পাঠ্যক্রমেই এগুলোর কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। মানুষের উচিত নিজের আগ্রহ থেকেই এসব সম্পর্কে জানা।
ভবিষ্যত লক্ষ্য
লক্ষ্য কখনো স্পেসিফিক হবে না, লক্ষ্য হবে এক্সিলেন্স। আমার লক্ষ্য সকলের লক্ষ্য পূরণে কাজ করা। জাতীয় অবস্থানে থেকে তরুণদের সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর পলিসি নিয়ে কাজ করা। কতখানি করতে পারব সেটা ভবিষ্যত বলবে!
ইত্তেফাক/ইউবি
