চট্টগ্রামে বাতিল পুরনো গাড়ীর যন্ত্রাংশের ব্যবসায় নেমেছে চরম ধস। ব্যবসায়ীরা বলছেন- তাদের ব্যবসা এখন গুরুতর মন্দার শিকার। ক্রেতা নেই, বাজারে তাই ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততাও নেই। মুরাদপুরের জাহাঙ্গীর মার্কেট, ইউনুস মার্কেট এবং রেলক্রসিং সংলগ্ন বাতিল গাড়ীর পুরনো যন্ত্রাংশের পাঁচশ ব্যবসায়ীর এখন মাথায় হাত। আর্থিক ক্ষতি, দায়দেনা দিনদিন বাড়ছেই। বহু দোকানপাট বন্ধ করে দিন কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যে সব দোকান খোলা থাকছে সেসবে গাড়ীর গ্যারেজ থেকে পুরনো যন্ত্রাংশ কিনতে ক্রেতা আসে কালেভদ্রে একজন কি দুইজন। এরকম অল্প বেচাকেনায় দোকান ভাড়া, দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিনই গুনছেন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত প্রায় ৪০/৫০ বছর ধরে স্ক্র্যাপ বা পুরনো গাড়ি ভেঙে ভারী ও হালকা অটোমোবাইল বা যানবাহনের পুরনো যন্ত্রাংশের অন্যতম বাজার হিসেবে গড়ে উঠেছিলো মুরাদপুরের এই বাজার। গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে এই বাজারে গাড়ির যন্ত্রাংশ সংগ্রহে গাড়ির মালিক ও বিভিন্ন গ্যারেজের লোকজনদের প্রচণ্ড ভিড় থাকতো সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি। ২০০৬ ও ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই বাজারের পুরনো যন্ত্রাংশের চাহিদা এতো বেশি ছিলো যে, ব্যবসায়ীরা তার যোগান দিতে হিমশিম খেতেন। এখানে পাঁচশ ব্যবসায়ীর প্রায় সকলেই মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; কিন্তু প্রায় ১০/১২ বছর আগে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, মালয়েশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে গাড়ির পুরনো ও রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন, স্ক্র্যাপ হিসেবে বাতিল গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশ কন্টেইনারে করে সমুদ্রপথে আমদানি শুরু করলে সংকটের শুরু হয়। আমদানিকারকরা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত রিকন্ডিশন্ড ও পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন, পুরনো যন্ত্রাংশ নিজেরা বিক্রি শুরু করলে মুরাদপুরের বাজারের চাহিদা দ্রুত কমে যেতে শুরু করে। অনেক সেকেন্ড পার্টি আমদানিকারকদের কাছ থেকে ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ কিনে এনে স্থানীয় বাজারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে বিক্রি শুরু করলে মুরাদপুরের বাজার দিনদিন ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়তে থাকে।
মুরাদপুরের ইউনুস মার্কেট, রেলক্রসিং এবং জাহাঙ্গীর মার্কেট সংলগ্ন বাতিল গাড়ীর পুরনো যন্ত্রাংশের বাজার সরেজমিনে পরিদর্শন করে এই বাজারের মন্দার করুণ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এখানে পুরনো ভারি যানবাহনের যন্ত্রাংশের বাজারের যে বেহাল পাশেই পুরনো হালকা যানবাহনের পুরনো যন্ত্রাংশের বাজারের একই অবস্থা দেখা গেছে। বরং হালকা যন্ত্রাংশের বাজারের ব্যবসায়ীরা টিকে থাকার জন্য তাদের কেউ কেউ স্থানীয় পুরনো যন্ত্রাংশ নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পুরনো যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন বিক্রি করা শুরু করেছে আমদানিকারকদের ডিলার হিসেবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমান এখানে বিক্রি করছেন ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানসহ ভারি যানবাহনের স্প্রিংসহ নানা ধরনের পুরনো যন্ত্রাংশ। তিনি জানান, ক্রেতা নেই। একজন দুইজন ক্রেতা আসলে তাকে নিয়ে সবাই টানা-হেঁচড়া শুরু করে। এখানে এক কিলোগ্রাম লোহার স্প্রিংয়ের প্রকৃত মূল্য ১৩০ টাকা। মন্দার কারণে কখনো কখনো সেসব ১২০ টাকা কেজিতে ছেড়ে দিতে হয়। তিনি জানান, ভারি ও হালকা গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশের যোগান আসে বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাতিল গাড়ি নিলামে ক্রয়কারী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এগুলো ভেঙেই এখানে পুরনো ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ বিক্রি করা হয়। গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে এখানে আমেরিকার বেডফোর্ড গাড়ি, ডজ গাড়ি, জার্মানী ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বাতিল গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশের ব্যাপক চাহিদা ছিলো। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশক এমনকি ২০০৫/২০০৬ সাল পর্যন্ত এখানে টয়োটা, টিএক্স-ট্রাক, বেডফোর্ডের ভারি যানবাহন, ইসুজু ও ভারতের টাটা কোম্পানির পুরনো যন্ত্রাংশের ব্যাপক চাহিদা ছিলো। এগুলোর মধ্যে ফ্রন্ট এক্সেল, পেছনের চাকার এক্সেল, চাকার রিং ও ইঞ্জিনের এতো চাহিদা ছিলো যে ক্রেতাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়তো; কিন্তু একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দুবাই থেকে কন্টেইনারে ভরে জাহাজে করে এসব যন্ত্রাংশ গত ১০/১২ বছর আগে থেকে আমদানি শুরু করলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পুরনো অটোমোবাইল যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ীরা মার খেতে শুরু করে। কারণ স্ক্র্যাপ হিসেবে আমদানিকৃত বিদেশি ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের দাম স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের চেয়ে অনেক কম পড়ে। ফলে আমরা মার খেতে শুরু করি। তিনি বলেন হাল আমলে ভারত ও চীন থেকে যেসব গাড়ি আসছে সেগুলোর সাথে যন্ত্রাংশের যোগান থাকায় পুরনো যন্ত্রাংশ কিনতে এখানে কেউ আর আসছে না।
পুরনো যন্ত্রাংশের বাজার জাহাঙ্গীর মার্কেটের ব্যবসায়ী হাজী মোহাম্মদ হাসেমসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীও জানালেন একই কথা। তারা জানালেন হালকা যানবাহনের বাজারে বিদেশ থকে আমদানিকৃত পুরনো বা রিকন্ডিশন্ড ইঞ্জিন কোনো হালকা যানবাহনে মাত্র ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় লাগানো হচ্ছে। অথচ এর জন্য ক্রেতারা পুরনো স্থানীয় যন্ত্রাংশের বাজারে এসে আড়াই লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ করতে রাজি নয়। অথচ ১০/১২ বছর আগে এখানে একটি পুরনো গাড়ি কাটা হলে ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশ কেনার জন্য ক্রেতারা ঝাঁপিয়ে পড়তেন।
ইত্তেফাক/আরকেজি
