আসন্ন সংসদ নির্বাচন

এখনও আসন বণ্টনের আলোচনা নেই ১৪ দলে

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ০৪:২৫
‘নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা’- নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেয়া এই সময়সূচি ধরে হিসাব কষলে ভোটের বাকি আর দুই থেকে বড় জোর আড়াই মাস। তবে ভোট ঘনিয়ে এলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে আসন বণ্টন নিয়ে এখনও আলোচনা শুরু হয়নি। আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আগে আগে ফয়সালা করার জন্য গত কয়েক মাস ধরে শরিকদের কেউ কেউ তাগাদা দিলেও আওয়ামী লীগ এখনও তা আমলে নেয়নি। এনিয়ে শরিকদের বেশিরভাগই এক ধরনের অস্বস্তিতে, কেউ কেউ প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভেতরে-ভেতরে কিছুটা সংক্ষুব্ধও।
 
১৪ দলের একাধিক শরিক দলের নেতারা ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলোচনায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ বিদ্যমান জোট শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টনের আলোচনা শুরু করছে না। অথচ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মিত্র বাড়ানোর জন্য দলটি তোড়জোড় শুরু করেছে। নিবন্ধন নেই, রাজধানীতে কেন্দ্রীয় কার্যালয় পর্যন্ত নেই- এমন ছোটখাটো দলকেও বন্ধুবলয়ে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। কেন, কি কারণে এসব দলের পেছনে ছুটছে সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন শরিকদের কেউ কেউ।
 
ভোটের বাকি বেশিদিন না থাকলেও আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু না হওয়ার বিষয়ে ১৪ দলের সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘১৪ দলের নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব দ্রুত বৈঠকে বসবেন। বৈঠকের তারিখ এখনও ঠিক হয়নি। কয়েকদিন আগেই বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর নানা ব্যস্ততার কারণে সেটি হয়নি। আশা করছি আগামীকাল রবিবার সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সংসদ ভবনেই যে কোনদিন ১৪ দল নেতাদের নিয়ে বসবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন এবং ১৪ দলের আসন ভাগাভাগির বিষয় নিয়ে নিশ্চয়ই কথা হবে।’
 
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ১৪ দলের সঙ্গে কখন আসন বণ্টন হয়েছিল, সে বিষয়ে জানা গেছে, তখনও তফসিল ঘোষণার পরেই শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা হয়। কিছু সমঝোতা হয়েছিল আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের প্রাক্কালে। আর কিছু সমঝোতা হয়েছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়ে।
 
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, এবারও তফসিলের পরেই আসন বণ্টনের বিষয়টি ফয়সালা করতে চায় আওয়ামী লীগ। তাছাড়া বিএনপি এবং দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেও তাকিয়ে আছেন ক্ষমতাসীনেরা। বিএনপি ও দলটির নতুন-পুরনো রাজনৈতিক মিত্ররা ভোটে এলে এক ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগ, আর তারা ভোটে না এলে আরেক রকম নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ করবে।
 
শুধু আওয়ামী লীগ-ই নয়, এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিও (জাপা) নির্বাচনের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে তাকিয়ে আছে বিএনপির দিকে। বিএনপি ভোটে এলে এক ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে জাপা, বিএনপি না এলে ভিন্ন সমীকরণে নির্বাচনে লড়বে বর্তমান সংসদের এই প্রধান বিরোধী দল। জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ এরইমধ্যে বলেছেন, বিএনপি ভোটে এলে আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আবারও মহাজোট গঠন করে নির্বাচন করবো, আর বিএনপি না এলে জাপা এককভাবেই নির্বাচন করবে। আজ শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠেয় জাপার নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোট-ইউএনএ’র মহাসমাবেশেও এ ব্যাপারে কথা বলতে পারেন এরশাদ।
 
এ বিষয়ে মোহাম্মদ নাসিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, বিএনপিসহ তাদের পুরনো জোট ২০ দল ও নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোটে আসে কি-না কিংবা আবারও তারা নির্বাচন বয়কট করে কি-না; এটার ওপরও আমাদের ১৪ দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগির ফয়সালা নির্ভর করছে। যদি বিএনপি ও তাদের জোট ভোটে আসে, সেক্ষেত্রে এরশাদের জাপাকে নিয়ে আমরা আবারও মহাজোট করতে পারি। তখন ১৪ দলের বর্তমান শরিকদের পাশাপাশি এরশাদ সাহেবের দল থাকবে, আরো কিছু দল ও জোটও আছে যাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আমাদের কথাবার্তা হয়েছে; তখন সবাইকে নিয়েই আসনের বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। আর যদি বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ভোটে না আসে তাহলে সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ১৪ দলকে নিয়েই একত্রে নির্বাচন করবে, আর এরশাদের দল একা নির্বাচন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরইমধ্যে বলেছেন যে- আমরা ১৪ দলের বন্ধুদের নিয়েই একত্রে নির্বাচন করবো।’
 
‘আপনি তো এর আগে ইত্তেফাকের সঙ্গেই আলাপকালে বলেছিলেন- বিএনপি ভোটে আসুক বা না আসুক এরশাদকে আওয়ামী লীগ জোটে নেবে না, এরশাদ একাই নির্বাচন করবেন’- এই প্রশ্ন করা হলে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘সেটা অনেক আগে বলেছিলাম। এখনকার প্রেক্ষাপট তো ভিন্ন। তারপরেও সামগ্রিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।’
 
নির্বাচনি কৌশল চূড়ান্ত করতে আওয়ামী লীগ বিএনপির সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ১৪ দলের শরিকদের কেউ কেউ বলছেন, আসন বণ্টনের বিষয়টি সুরাহা হওয়া জরুরি। কারণ ডিসেম্বরে বা জানুয়ারির প্রথমার্ধ্বে ভোট- এমন পথনকশা ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। প্রায় সারাদেশে সংসদীয় এলাকাভিত্তিক ভোটের প্রাথমিক তোড়জোড়ও শুরু করেছেন দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে প্রান্তিক নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে কথাও বলেছে। তবে আসন বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে এখনও কথা না হওয়ায় ১৪ দলের অন্য শরিক দলগুলোর নেতারা ওইভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। এনিয়ে শরিক দলগুলোর ভেতরেও নেতা-কর্মীদের, বিশেষ করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ক্ষোভ রয়েছে।
 
এ ব্যাপারে ১৪ দল শরিক জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আসন বণ্টন নিয়ে ১৪ দলে এখনও আলোচনা হয়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো তালিকাও আদান-প্রদান হয়নি। তবে নির্বাচন জোটবব্ধ করবো- এই সিদ্ধান্ত আছে। আমি মনে করি, আসন বণ্টনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করা দরকার, এটা দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। যতদ্রুত এটা নিষ্পত্তি হবে, দল ও জোটের সবার জন্যই এটা মঙ্গলকর। তাহলে সবার ভোটের প্রস্তুতিটাও ভালো হবে, ১৪ দলের আগামীতেও বিজয় সহজ হবে। আর আসন বণ্টনের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হলে সেটি একদিকে যেমন ভোটের প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটাবে, তেমনি জোটের বিজয়েও বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।’
 
ভোটের সময় তাড়াহুড়া না করে আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আগেভাগে ফয়সালা করার জন্য গত প্রায় এক বছর ধরেই তাগাদা দিয়ে আসছেন ১৪ দলের আরেক শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বহুবার তাগাদা দিলেও এখন পর্যন্ত আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। এটা ফয়সালা করা দরকার।’
 
হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননসহ কেউ কেউ আসনের ফয়সালার তাগিদ দিলেও ১৪ দল শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি জোটের শরিকদের সঙ্গে পৃথকভাবে বসার মতো সময় প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছেন না। সেজন্য ১৪ দলের সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একত্রে সহসাই একটি বৈঠক করবেন। সম্ভাব্য এই বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা হবে। আর আসনের বিষয়ে তো এখন ওইভাবে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করাও সম্ভব হবে না। কারণ বিএনপিসহ তাদের জোট যদি ভোটে আসে সেক্ষেত্রে ১৪ দলের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগও নির্বাচনী বৃহত্তর ঐক্যজোট গঠন করতে পারে। তাছাড়া গতবারও ১৪ দলের আসন সমঝোতা হয়েছিল তফসিলের পর।’
 
১৪ দলের আরেক অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি-জেপি’র সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমাদের ১৪ দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, শরিকরা নিজেদের মতো করে সবাই দলীয়ভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে। এরপর শরিকরা স্ব স্ব দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকে বসবে। যেখানে যিনি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো থাকবেন তিনিই জোটের মনোনয়ন পাবেন, সেক্ষেত্রে তিনি যে দলেরই হোন না কেন।’
 
ইত্তেফাক/আরকেজি