যশোরের চৌগাছায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এখানকার শিশু শ্রমিকের সংখ্যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান জানা না গেলেও এ উপজেলায় রয়েছে কয়েক হাজার শিশু শ্রমিক। স্বল্পমূল্যে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে এসব শিশুরা।
উপজেলার শিশু শ্রমিকদের অধিকাংশ মোটর গ্যারেজ, হোটেল রেস্তরায়, কাঁচা বাজারে, ওয়েলডিংয়ের দোকানে, বাস-ট্রাকের হেলপার, বাদাম বিক্রেতা, মুদি দোকানের কর্মচারী, নির্মান কাজসহ ভ্যান চালানোর মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত।
যে বয়সে এসব শিশুদের বই-খাতা কলম হাতে স্কুলে যাবার কথা অথচ সেই বয়সে এরা তাদের পরিবারের অর্থ উপার্জন সহায়কের কাজে নিয়োজিত। আবার পরিবারে জ্বালানী সংগ্রহ কাজে ছোট ছোট শিশুদের ব্যস্ত থাকতেও দেখা যায়।
জানা যায়, দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের বই খাতা ফেলে পরিবারের সহযোগীতা করতে শ্রম বিক্রি করতে এসছে এসব শিশুরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন শ্রম বিক্রি করে আয় হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। নিজেদের ক্ষুধা নিবারণ ও পরিবারে অন্যদের মুখে দুই মুঠো আহার যোগাতে সাহায্য করার চেষ্টা করে এরা। অনেক দরিদ্র পরিবারের বৃদ্ধ পিতা মাতাকে বেঁচে থাকতে নির্ভর করতে হয় এসব শিশু সন্তানের ওপর। ফলে বাধ্য হয়ে তারা শ্রমিকের পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে।
এসব শিশু শ্রমিকদের কেউ কেউ প্রতিদিন ১০/১২ ঘন্টা পর্যন্ত শ্রম বিক্রি করে। উপজেলা সদরে বেশ কয়েকজন শিশু শ্রমিক নিয়োগ কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়ষ্ক শ্রমিকদের পাশাপাশি শিশুদের নিয়োগ করা হয়ে থাকে।
এক জন রাজ মিস্ত্রি জনান, নির্মান কাজে প্রাপ্ত বয়ষ্ক শ্রমিকের পাশাপাশি কম বয়ষ্ক শ্রমিকও নিয়োগ করা হয়। কারণ হিসাবে তিনি জানান, কম বয়ষ্ক শ্রমিক নিয়োগে সুবিধা বেশি। এদের বেতন কম অথচ কাজ করে প্রায় একজন বয়স্ক শ্রমিকের সমান।
এক জন গ্যারেজ মালিক জানান তার প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্তবয়ষ্ক তিনজন মেকানিক কাজ করে। সেই সঙ্গে আছে দুজন শিশু শ্রমিক। এরা কারখানার ছোট খাটো কাজ করে থাকে। আর এই সামান্য কাজের জন্য পূর্ণবয়স্ক একজন কর্মী নিয়োগ করলে খরচ বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে শিশু শ্রমিক নিলে টাকা কম খরচ হয়। এ ছাড়া অনেক শিশু কাজ শেখার জন্য কোনোরকম পারিশ্রমিক ছাড়া শুধু তিনবার ক্ষুধা নিবারণ করে সারাদিন কাজ করে চলেছে। আবার অনেকে দিন হাজিরা হিসাবে হোটেলে কাজ করে থাকে। সারাদিন হোটেলে কাজ করে একবার খাওয়া ও দিনে ৮০ থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে।
চাঁদপাড় গ্রামের আলিমের ছেলে ভ্যান চালক ইমনের (১৪) সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় তাকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে সংসার চালাতে ভ্যান চালাতে হচ্ছে। তবে ভ্যানে এখন ইঞ্জিন ফিট করায় আগের মতো কষ্ট হয় না।
চৌগাছা বাজারে একটি ওয়েলডিং কারখানায় কর্মরত শিশু শ্রমিক মেহেদী হাসান রাব্বি ওরফে অন্তর (১৫) জানায় তার বাড়ি যশোর লেবুতলা বাজারের পাশে সষনুদহ। পিতার নাম আশাদুল। সংসারের অভাব অনটনের জন্য সে চৌগাছার টেংগুরপুর গ্রামের নানা রবিউল ইসলামের বাড়ি থেকে চৌগাছা বাজারে ওয়েল্ডিংয়ের মতো কঠিন কাজ করছে।
শিশু শ্রমিক আইন অনুযায়ী শিশুদের ঝুকিপূর্ণসহ যে কোনো ধরনের কাজ করানো নিষিদ্ধ হলেও চৌগাছায় সে আইন মানা হচ্ছে না। এমনকি চৌগাছার কোন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্মরত শিশু শ্রমিকের কোনো পরিসংখ্যান পর্যন্ত নেই।
এ ব্যাপারে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফুল আলম জানান, ১৮ বছরের নীচে শিশুকে কোনো মালিক ভারি কাজে নিয়োগ করতে পারবে না। যদি কেউ নিয়োগ করে কাজ করায় তাহলে আমরা জানতে পারলে শিশুশ্রম আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।
তিনি আরো জানান, উপজেলা পর্যায়ে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা নির্ণয়ের তেমন ব্যবস্থা নেই।
ইত্তেফাক/নূহু
