আগৈলঝাড়ার শুঁটকির কদর এখন বিদেশেও

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:২৮
স্বাদু পানির দেশি প্রজাতির মৎস্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বরিশালের আগৈলঝাড়ার রাজাপুর শুঁটকি পল্লিতে বেশ উৎসব ভাব চলছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে উৎপাদিত এই শুঁটকির কদর এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। তবে আগের মত দেশি প্রজাতির মাছের স্বল্পতার কারণে হতাশায় ভুগছেন শুঁটকি পল্লির সাথে জীবিকা নির্বাহ করা মৎস্যজীবি পরিবারগুলো।
 
আগৈলঝাড়া উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের পশ্চিম সীমান্তবর্তী রাজাপুর গ্রাম। এই গ্রামের সাথেই ভৌগলকিভাবে জড়িত রয়েছে রামশীল, জহরেরকান্দি, ত্রিমুখিগ্রাম।  
 
রাজাপুর গ্রামের শুঁটকি ব্যবসায়ী অবনী রায় জানান, তিনি গত এক যুগ ধরে এই মৌসুমে শুঁটকি মাছের ব্যবসা করে আসছেন। অবনী বাড়ৈ বলেন, রাজাপুর, রামশীল, জহরেরেকান্দি গ্রামসহ এ অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক পরিবার শুঁটকি মাছের ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে একপাশে সন্ধ্যা নদী অববাহিকা এলাকা অন্যপাশে কোটালীপাড়ার বিল এলাকার মধ্যবর্তী উপজেলার পয়সারহাট-ত্রিমুখী-রাজাপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শুঁটকি পল্লি। 
 
বিলাঞ্চলের স্বাদু ও মিঠা পানির নানা প্রজাতির শুঁটকি মাছ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। কোন প্রকার রাসায়নিক বা কেমিকেল ব্যবহার না করায় শুধুমাত্র প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা শুঁটকি পল্লির বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলসহ এখন ভারতের আগরতলা পর্যন্ত ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
 
তবে আগের তুলনায় দেশি ছোট পুঁটি, দেশি সরপুঁটি, পাবদা, কৈ, শোল, রয়না, খলশা, মাছসহ দেশি প্রজাতীর অনেক মাছের সংখ্যা এখন অনেক কমে গেছে। দুষ্প্রপ্য হয়ে উঠেছে অনেক প্রজাতির দেশি মাছ। শুঁটকি পল্লির সাথে জড়িত পরিবারগুলো মৌসুমী লাভের আশায় বছরের আশ্বিন মাসের প্রথম থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত ছয় মাস এই পেশায় নিয়োজিত থাকে। এই শুঁটকি পল্লির সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাহিদা রয়েছে সিঁধল শুঁটকির। যার প্রধান চাহিদা রয়েছে ঢাকা ও চট্টগামের বাজারে। সৌখিন ক্রেতারাও এই শুঁটকি পল্লি দেখতে এসে তাদের চাহিদানুযায়ী শুঁটকি মাছ ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন। 
 
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বাজার থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যায়। আবার ঢাকার কাওরান বাজার মোকামে গিয়েও পাইকারী মাছ বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরাই মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যমে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে শুঁটকি মাছের ব্যবসা করলেও মৌসুম শেষে ওই দাদন ও ঋণের টাকা পরিশোধ করে তাদের হাতে আর তেমন লাভ থাকে না। মৌসুম শেষে তাদের জীবনে নেমে আসে হতাশা।
 
স্থানীয়রা জানান, একযুগ আগে ভৌগলিক পরিবেশের কারণে বাণিজ্যিক ভাবে গড়ে ওঠা পয়সারহাট-রাজাপুর-ত্রিমুখী শুঁটকি পল্লিতে দেশি প্রজাতির বিভিন্ন প্রকার মাছের মধ্যে পুঁটি, শৌল, টেংরা, খলশা, পাবদা, কৈ, শিং, মাগুর, মেনি, ফলি, বজুরী, বাইন মাছ অন্যতম। এ শুঁটকি পল্লিতে দেশি প্রজাতির মাছগুলো আঁশ ছাড়িয়ে কেটে, পানিতে পরিষ্কার করে প্রাকৃতিক নিয়মে রোদে শুকিয়ে বিক্রির জন্য মজুদ করা হয়। এখানে ফরমালিনের মতো বিষাক্ত কোন রাসায়নিক দ্রব্য মাছে মেশানো হয়না। 
IMG0
অবনী রায় আরো জানান, চাহিদার মধ্যে ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ থাকে পুঁটি মাছের ওপর। প্রতি মন পুঁটি মাছ সাইজ ভেদে তাদের ক্রয় করতে হচ্ছে দুই হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকায়।  প্রতি মন বাইম মাছের দাম আট থেকে ১০ হাজার টাকা, বুজরী চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, যা এখন প্রায় পাওয়াই যায় না।
 
পল্লির অপর ব্যবসায়ী মনমথ রায়, অশোক রায়, নরেশ তালুকদার বলেন, বাজার থেকে একমণ কাঁচা মাছ ক্রয় করে শুকালে ১৫-২০ কেজি শুঁটকি মাছ পাওয়া যায়। গড়ে প্রায় তিন মণ কাঁচা মাছ শুকালে এক মণ শুঁটকি মাছ পাওয়া যায়। এক মণ পুঁটি মাছের শুঁটকি সাত থেকে আট হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। 
 
শুঁটকি পল্লির মাছ কাটার কাজে নিয়োজিত রাজাপুর গ্রামের সন্ধ্যা অধিকারী, আয়না বেগম, পপি অধিকারী, শোভা রানী জানান, বছরে ছয় মাস মাছ কাটার সাথে তারা নিয়োজিত থাকলেও বাকি ছয়মাস কাটে তাদের অনাহারে-অর্ধাহারে। তারা বলেন, ছেলে-মেয়েরা স্কুলে লেখাপড়া করছে। মাছ কেটে যা আয় করি তা দিয়ে বহুকষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বর্তমানে শুকনা মৌসুমের শুরুতে মাছ বেশী পাওয়া গেলেও কার্তিক মাসের পর বিলে মাছ কম থাকায় তাদের দুঃখ দুর্দশা আরো বেড়ে যায়। 
 
শুঁটকি ব্যবসায়ী রাজাপুরের অবনী রায় বলেন, সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় প্রতি বছরই তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। তাই শুঁটকি পল্লির সাথে জড়িত মৎস্যজীবীরা বছরের পর বছর সরকারের সংশ্লিষ্ট মৎস্য বিভাগের কাছে সহজ শর্তে ঋণ দাবি করে আসলেও বরাবরই তা উপেক্ষিত হয়ে আসছে। 
 
ইত্তেফাক/এমআই