ইস্ত্রিই যার লেখাপড়া ও জীবিকার একমাত্র হাতিয়ার

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:৫৫
মাঝারি সাইজের পিতলের ইস্ত্রি। তার ভিতর জ্বলন্ত লাল কয়লা। কয়লার আগুনে গরম হচ্ছে ইস্ত্রি। আর ওই গরম ইস্ত্রি দিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করে লেখাপড়া ও সংসার চালাচ্ছে কিশোর সালমান। 
 
না এটা কোন উনিশ শতকের ধোপাবাড়ির গল্প নয়, এটা বিশ শতকের বাস্তব চিত্র। বিদ্যুৎ আর প্রযুক্তির এই ডিজিটাল যুগে কয়লার ইস্ত্রি এখন বিরল। তবে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের মাওহা বাজারে প্রতি হাটবার বিকালে এমন এক দৃশ্য চোখে পড়বে। রাস্তার পাশে টেবিল রেখে এক কিশোর ছেলে কয়লাচালিত ইস্ত্রি দিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করছে।
 
কাছে গিয়ে কিশোরের সঙ্গে কথা হয়। জানা যায় তার নাম আশরাফুল আলম সালমান (১৩)। সে মাওহা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাওহা গ্রামেই তাদের বাড়ি। তার বাবার নাম আকবর আলী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট সালমান। অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনার খরচ দিতে পারতো না পরিবার। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে দুই বছর  ধরে এই কাজ করছে।  
 
কাপড় ইস্ত্রির ফাকে কথা হচ্ছিল সালমানের সঙ্গে। ধুয়ে পরিষ্কার করা কুচকে যাওয়া কাপড়কে আবার টানটান করে তার স্বরূপে ফিরিয়ে আনতেই ইস্ত্রি করা হয়। ইস্ত্রির ফাঁকা অংশগুলো দিয়ে দেখা যাচ্ছে লাল জ্বলন্ত কয়লা। কয়লা যখন পুড়তে পুড়তে সাদা ছাইয়ে পরিণত হয়, তখন ইস্ত্রির হাতলের নিচে ঢাকনা খুলে আবার নতুন করে কয়লা দেওয়া হয়। 
 
সালমান জানায়, ইস্ত্রিতে একবার কয়লা ভরে আগুন জ্বেলে দিলে ঘণ্টা খানেকর মতো চলে। এই সময়ে ১০/১২ টি কাপড় ইস্ত্রি করা যায়। এখানে কয়লাও কেনা যায় অল্প টাকায়। ফলে খরচও কম। 
 
সালমান জানায়, তার মা গৃহিণী। বড় দুই ভাই ঢাকায় থাকে। বড় বোন এসএসসি পরীক্ষার্থী। বসতভিটা ছাড়া তাদের আবাদি কোনো জমি নেই। বৃদ্ধ বাবা কর্ম অক্ষম হয়ে যাওয়ায় সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে দুই বছর ধরে এই কাজ করছে সে।  শুধু তাই নয়  নিজের আয়ের টাকা থেকে সে বোনের পড়াশোনার খরচেও টুকটাক সহযোগিতা করে।
 
এরই মধ্যে বিকেল গড়িয়ে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে সূর্য। মাওহা বাজারে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করেছে। এমন সময় বাজারের ব্যাগ হাতে উপস্থিত হলেন সালমানের বাবা আকবর আলী। কিন্তু তখনো বাজারের টাকা যোগাড় করতে পারেনি সালমান। তাই বৃদ্ধ বাবা ও ছেলে গ্রাহকের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা চলতে থাকে। 
IMG0
 
কথার এক ফাঁকে আকবর আলী বলেন, ‘সংগ্রামের কয়েক বৎসর পরে তেইশ্য টেকা দিয়া কয়লার এই ইসতারিডা কিইন্যা আনি। তহন তো গেরামে কারেন্ট আছিলো না। হেই সময়ে আমার লন্ড্রির ব্যবসাডাও ভালা ছিলো। পরে কারেন্টের ইসতারি আওনের পরে কয়লার ইসতারির চল কইম্যা যায়।’
 
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এহন আর কয়লার ইসতারি (ইস্ত্রি) পাইবেন কই? এসব এখন আর নাই। কারেন্ট আহনের আগে তো এগুলো দিয়াই কাপড় ডলতো সবাই।’
 
প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার মাওহা বাজারে, শুক্র ও সোমবার ভুটিয়ারকোণা বাজারে রাস্তার পাশে টেবিল বসিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করেন সালমান। প্রতিটি কাপড় ইস্ত্রি করতে ৫ টাকা করে নেয় সে। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাপড় ইস্ত্রি করে করে তার আয় হয় ১শ’ থেকে দেড়শ টাকার মতো।  
 
গল্পের ফাঁকে সালমান বলেন, কয়লার আগুন জ্বেলেই এখন জীবন চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চাই। জীবিকার তাগিদে হয়তো এখন এই কাজ করছি। কিন্তু যখন চাকরি করবো তখন আর আমাকে ইস্ত্রি নিয়ে রাস্তায় দাড়াতে হবে না।  
 
এরই মধ্যে গ্রামের এক বাসিন্দা চলে এসেছে পড়নের পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করতে। তাই কথা শেষ না করেই কাপড় ইস্ত্রিতে মন দিলো সালামান। পিতলের ওপর বসানো কাঠের হাতল ধরে এক মনে কাপড় ইস্ত্রি করে যাচ্ছে। সন্ধ্যার অন্ধকার কেটে যেন সালমানের জীবনে সূর্যের আলো ফোটে উঠে।
 
ইত্তেফাক/জেডএইচ