দিন ফুরিয়ে রাত নামলে বা রাতের শেষে নতুন একটি দিনের শুরু হলে প্রাণীর দেহেও দেখা দেয় পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই চলে। প্রাণীর দেহ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে বেশ সাবলীলভাবে খাপ খাইয়ে নেয়। প্রাণীর দেহের এই দেহঘড়িকে ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে গত বছর নোবেল জিতেছেন তিন বিজ্ঞানী। ঐ তিন বিজ্ঞানীর মতে, দিন বা রাত হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রাণীর দেহ যে ধরনের আচরণ করে বা যে রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা আসলে শরীরের একটি অভ্যন্তরীণ আণবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই পরিবর্তনকে তারা নাম দিয়েছেন ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা বডি ক্লক।
সার্কাডিয়ান রিদম' হলো একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যা প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একবার চক্র পূরণ করে এবং জীবিত বস্তুর অস্তিত্বকে এক অদৃশ্য ছন্দে বেঁধে দেয়। একেই বলা হয় দেহঘড়ি। এই দেহঘড়ি সম্পর্কে মানুষের অনেক কিছুই অজানা। সার্কাডিয়ান রিদমের শুরু সৃষ্টির শুরু থেকে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে প্রথম যখন কোনো কোষের জন্ম তখন থেকেই চলে আসছে এই সার্কাডিয়ান রিদম।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির কারণে দিনের বেলায় যে কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেগুলো রাতের বেলা নিজেদের সারিয়ে নেয়। যে কোনো জীবিত সত্তা যেটির গঠন ও আকৃতি যাই হোক না কেন সেটি যদি সূর্য থেকে নিজের শক্তি সংগ্রহ করে তাহলে সেটির দেহঘড়ি থাকবেই। আলো ও অন্ধকারের সূত্র মেনে এই ঘড়ি কাজ করবে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, লজ্জাবতী পাতা অন্ধকারেও নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং মেলে ধরে। অর্থাত্ সূর্যঘড়ি অনুসরণ না করে লজ্জাবতী তার দেহঘড়ি মেনে চলে।
দেহঘড়ি সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো দেহঘড়ি জীবকে সীমানার বোধ তৈরি করে দেয়। দেহঘড়ি জীবকে নানা ধরনের সুবিধা দেয়। যেমন দেহঘড়ির কারণে জীব দিন-রাত ও শীত-গ্রীষ্মের তফাত্ বুঝতে পারে। আর সেই অনুযায়ী শরীর নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গড়ে তোলে।
এমন অনেক সময় আসে যখন ঘড়ি ছাড়াই মানুষ সময়ের হিসাব কষতে পারে। মূলত শরীরের মধ্যে থাকা মহাঘড়িই তাকে সময়ের অনুভূতি দেয়। দিনজুড়ে সমস্ত শরীরে যে সকল সিগন্যাল বা নির্দেশাবলির আদান-প্রদান চলতে থাকে এখান থেকেই তার সব নিয়ন্ত্রণ ঘটে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ এবং টিস্যুরও রয়েছে নিজস্ব ঘড়ি, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় যার চক্র পূরণ হয়। এই ঘড়িগুলোকে একটি তাল ও লয়ে বেঁধে রাখে হাইপোথেলামাসে থাকা সেই মহাঘড়ি।
মানব শরীরে রয়েছে সারক্যানুয়াল রিদম। রাত যত দীর্ঘ হয়, ঘুম যত প্রলম্বিত হয়, মস্তিষ্ক তত মেলাটোন নিষ্কাশন করে। এই হরমোনের কারণেই মানুষের ঘুম ও জেগে উঠা নিয়ন্ত্রিত হয়। অনেক প্রাণী, যেমন হরিণ, এই ছন্দ মেনেই সঙ্গম ও হাইবারনেশানের জন্য প্রস্তুত করে। রোগ-বালাই ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার জন্য মানুষের শরীর শীতকালে বেশি মাত্রায় এন্টিবডি তৈরি করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যালোক মানুষকে রাখে সুষম, সুস্থির। একারণে সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন সূর্যালোকেও কিছু সময় কাটানো উচিত। যদি কাউকে নিরবচ্ছিন্নভাবে অন্ধকারে ফেলে রাখা হয় তাহলে তার দেহঘড়ি ২৪ ঘন্টা পিছিয়ে পড়বে।
ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠার পর থেকেই শরীরে ঘুমের জন্য একটু-একটু করে চাপ তৈরি হতে থাকে। কিন্তু এর জন্যই সারা দিন ধরে ঘুমের উদ্রেক ঘটে না। বরং দেহঘড়িই আপনাকে জানিয়ে দেয় আপনার ঘুমের সময়। দেহঘড়ি যখন বলে, এখনই ঘুমের উপযুক্ত সময় তখনই শরীর ঘুমে ঢলে পড়বে।
কিশোর-কিশোরীদের ওপর দেহঘড়ির মারাত্মক প্রভাব কাজ করে। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের শরীরে অনেক বেশি মাত্রায় হরমোন প্রবাহিত হয়। এর ফলে, এই বয়সীদের দেহঘড়ি ঘন্টা দুয়েক পেছানো থাকে। তাই অতি ভোরে তাদের ঘুম থেকে জোর করে ডেকে না তুলে আরও কিছুক্ষণ ঘুমাতে দেওয়া উচিত। বয়ঃসন্ধিকাল কেটে গেলে তাদের দেহঘড়ি পুনরায় বদলে যায়।-বিবিসি
ইত্তেফাক/নূহু
