আইনজীবী হয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া অসহায় নিগৃহীত, নিপীড়িত মানুষকে আইনি সহায়তা দেবেন সে লক্ষ্যে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন তিনি। ভাগ্যক্রমে মানুষটি চলে আসেন শিক্ষা সেবায়। তিনি বর্তমানে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। তার নাম মোঃ সিরাজুল ইসলাম। দেশের সার্বিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যখন শিক্ষাসচেতন ব্যক্তিদের মনে নেতিবাচক প্রশ্ন তখন দেশের হাতেগোনা যে কজন শিক্ষা কর্মকর্তা বৈপ্লবিক পরিবর্তনে ভুমিকা রাখছেন তাদের অন্যতম সিরাজুল ইসলাম।
৩০তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সিরাজুল ইসলাম ২০১২ সালে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসাবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগদান করেন। ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায় প্রথম উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসাবে তার পদায়ন হয়।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার ক্যাটাগরিতে এ বছর জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উপজেলা শিক্ষা অফিসার নির্বাচিত হন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো.সিরাজূল ইসলাম। তিনি ২০১৭ সালেও কুৃষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মনোনীত হয়েছিলেন।
তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য যে সকল কার্যক্রম ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ
তিনি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন এবং সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে মিরপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ ও সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ, সমন্বয় সাধন ও সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।
মিরপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের দৈনন্দিন সেবা বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে যোগদানের অনুমতি, চিকিৎসাজনিত ছুটি এবং ছুটি শেষে যোগদানের অনুমতি, নৈমিত্তিক ছুটি, সংরক্ষিত ছুটি সংক্রান্ত অবহিতকরণ প্রভৃতি এবং বিভিন্ন প্রকার তথ্য আদান প্রদান অনলাইনে শুরু করেন যা বাংলাদেশের মধ্যে উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসাবে তিনিই প্রথম।
পূর্বের ন্যায় শিক্ষকদের এখন আর উপজেলা শিক্ষা অফিসে উল্লেখিত সেবাগুলোর জন্য আসতে হয় না। শিক্ষকবৃন্দ পূর্বের তুলনায় শ্রেণি কার্যক্রমে বেশি সময় দিতে পারছেন। এতে করে প্রাথমিক শিক্ষার দ্রূত মানোন্নয়ন ঘটছে। তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসে ওয়াই-ফাই জোন স্থাপনসহ সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেন ই-মনিটরিং এর আওতায় এনেছেন যা প্রাথমিক শিক্ষাকে ডিজিটালাইজডসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট মডেম সরবরাহ করে মিরপুর উপজেলার শতভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ইন্টারনেট কানেকটিভিটির আওতায় এনেছেন। প্রতিটি বিদ্যালয়ের নামে ই-মেইল আইডি খোলা বাধ্যতামূলক করেন। মিরপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের জন্য তিনি ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন।
দীর্ঘদিন কাবিং কার্যক্রম হতে বিরত থাকা মিরপুর উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে বালক ও বালিকাদের পৃথক পৃথক কাব দল গঠন করে কাবিং কার্যক্রমের সম্প্রসারণ করেন। কাবিং কার্যক্রম জোরদারকরণে তিনি কাবিং কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সকলকে নিয়ে মতবিনিময় ও উদ্বুদ্ধকরণ সভা করেন।
তামাকের উৎপাদনের জন্য উর্বর ভূমি খ্যাত মিরপুর উপজেলার শিশুদের ঝরে পড়া রোধে তিনি জেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু, বিভিন্ন বিদ্যালয়ে টিফিন বক্স প্রদান করেছেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন এবং বেঞ্চ সংকট নিরসনে পর্যাপ্ত সংখ্যক বেঞ্চ, বৈদ্যুতিক পাখা, নলকূপ স্থাপন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস, খাতা,কলম, পেন্সিলের ব্যবস্থা করেছেন।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য চমশা, হুইল চেয়ার ও ক্র্যাচের ব্যবস্থা করেছেন। বিদ্যালয়গুলোকে আকর্ষণীয় ও শিশুবান্ধব করতে দোলনা ও খেলনা, বৃক্ষ ও ফুলের গাছ রোপন এবং প্রতিটি বিদ্যালয় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। “পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়,আমাদের অঙ্গীকার; মিরপুরের প্রতিটি বিদ্যালয় রাখবো পরিষ্কার” শ্লোগান প্রবর্তন ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন।
তার ইনোভেটিভ কার্যক্রমে শিক্ষক সমাজ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটছে। তার উল্লেখযোগ্য ইনোভেশন- প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেনশন সেবা সহজীকরণে “আর নয় টেনশন, সময়মত পেনশন”, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দৈনন্দিন সেবা সহজীকরণে “অনলাইন সেবা ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন” জ্ঞান পিপাসু শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেট ভিত্তিক “জানতে চাই কর্নার” ও শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের জন্য “স্টুডেন্ট অব দ্যা ডে” অন্যতম।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক আয়োজিত ইনোভেশন ফেয়ার ও শোকেসিং ২০১৮ এ ই- ব্যবস্থাপনায় "সেরা উদ্ভাবক" হিসাবে স্বীকৃতি ও পদক লাভ করেন। তাঁর যোগদানের পূর্বে বিদ্যালয় পর্যায়ে কোন ইনোভেশন কার্যক্রম না থাকলেও বর্তমানে মিরপুর উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে ইনোভেটিভ কার্যক্রম চোখে পড়ে যা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার সফল বাস্তবায়ন এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যোগ্যতা ভিত্তিক শিখন কার্যাবলি পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা, ঝরে পড়ার হার কমিয়ে আনা প্রভৃতি যাবতীয় কর্মকাণ্ডের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টার ওপর। তাই প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান ও অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরস্কৃত করার লক্ষ্যে এ ধরনের কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
প্রাথমিক শিক্ষা পদক উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং চূড়ান্তভাবে জাতীয় পর্যায়ে বাছাই করা হয়। জাতীয়ভাবে নির্বাচিত বিভিন্ন ক্যাটাগরির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি পদক ও নগদ অর্থ প্রদান করে থাকেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা মো. সিরাজুল ইসলাম নিজের গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন এবং আটদাপুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা ও রাজবাড়ী সরকারি কলেজ হতে কৃতিত্বের সহিত বিজ্ঞান বিভাগ হতে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্র জীবনের প্রায় সকল স্তরে বৃত্তি লাভ ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ অর্জন করেন এবং আইন পেশায় নিজের নাম লেখান।
সিরাজুল ইসলাম রাজবাড়ী সদর উপজেলার নিজপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতার নাম তোমছের আলী মোল্লা।
ইত্তেফাক/নূহু
