মির্জাপুরে রোগীদের জিম্মি করে চলছে ডায়াগোনস্টিক সেন্টার-হাসপাতাল

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৫০
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে রোগীদের জিম্মি করে চিকিৎসার নামে চলছে গলাকাটা রমরমা ব্যবসা। প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগশাজসে অলি-গলিতে ব্যাঙের ছাতার মত অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল। অভিযোগ করা হয়, এ সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রতারণার মাধ্যমে রোগী ও তাদের স্বজনদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ডাক্তার ও ক্লিনিক মালিকরা। 
 
আজ শুক্রবার উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় সরেজমিন গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
 
জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলা সদর ও সদরের বাইরের ১৪ ইউনিয়নের হাট-বাজার এমনকি গ্রামেও গড়ে উঠেছে এ সব ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল। চটকপদ বিজ্ঞাপন আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নামের সাইন বোর্ড দিয়ে মির্জাপুরে এই ক্লিনিক ব্যবসা এখন জমজমাট। এ সব ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসেই প্রতারকদের খপ্পরে পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হাজার হাজার টাকা খোয়াচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। অবৈধ এ সব ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন নিরীহ লোকজন। প্রশাসন জেনেও এদের বিরুদ্ধে কোন আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভা, মহেড়া, জামুর্কি, ফতেপুর, বানাইল, আনাইতারা, ওয়ার্শি, ভাওড়া, বহুরিয়া, ভাদগ্রাম, লতিফপুর, গোড়াই, আজগানা, তরফপুর ও বাঁশতৈল ইউনিয়নের হাট বাজারও গ্রামে গঞ্জের অলি-গলিতে গড়ে উঠেছে এসব ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ক্লিনিকের মালিকদের রয়েছে সিন্ডিকেট চক্র। তারা প্রতিটি এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে মাইকিং করে রোগী ভাগিয়ে এনে কমিশন পান। আর সর্বশান্ত হচ্ছে নিরীহ লোকজন।
 
উপজেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, মির্জাপুরে তাদের ৩৫-৪০ টির মত ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল রয়েছে। সরকারি বিধিমোতাবেক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগোনস্টিক সেন্টার গড়ে তুলতে হলে জেলা সিভিল সার্জন অফিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন, অনুমোদন, মনোরম পরিবেশ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত চিকিৎসক ও দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স থাকতে হবে। 
 
কিন্ত খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মির্জাপুরে যে সব ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে, হাতে গোনা দু, একটি ছাড়া অধিকাংশই সরকারি নিয়মের ধার ধারেন না। এসব ক্লিনিকের মালিক, ক্লিনিক মালিক সমিতি ও সিন্ডিকেট চক্র সরকারি অফিসের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে অবৈধকে বৈধ হিসেবে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। 
 
উপজেলা সদরের কুমুদিনী হাসপাতাল রোড, পুরাতন বাস স্টেশনের পূর্ব ও পশ্চিম পাশ, বংশাই রোড, থানা রোড, বাওয়ার কুমারজানি রোড, পুষ্টকামুরী, জামুর্কি, পাকুল্যা, গোড়াই, দেওহাটা, হাটুভাঙ্গা ও বাঁশতৈল এলাকায় সবচেয়ে বেশী ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। যাদের অধিকাংশের নেই কোন সরকারি অনুমোদন।
 
সম্প্রতি কুমুদিনী হাসপাতাল রোডের মির্জাপুর জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগোনস্টিক সেন্টারে বাওয়ার কুমার জানি গ্রামের কাজল বিশ্বাস (২৭) নামে গৃহবধূ সন্তান প্রসব করতে এসে চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় মারা যান। এর আগেও এই ক্লিনিকে বেশ কয়েকজন রোগী ভুল চিকিৎসায় মারা যান। একই ভাবে সদরের নিউ আল মদিনা, বিকাশ হাসপাতাল, পাকুল্যা ও জামুর্কিসহ বেশ কয়েকটি ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা যান। স্বজনদের অভিযোগের পরও টাকা ও খুঁটির জোরে তারা পার পেয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন মির্জাপুরের সচেতন মহল।
 
এ ব্যাপারে ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি মো. আনিছুর রহমান মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মির্জাপুরে ৩৫-৪০টির মত ক্লিনিক, ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনসহ রেজিস্ট্রেশন থাকার কথা। নিয়ম মেনেই আমরা ক্লিনিক ও হাসপাতাল পরিচালনা করে আসছি। আমরা মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করি এবং কাজ করতে গেলে ভুল-ত্রুটি হতেই পারে। আবার সংসোধনের পথও রয়েছে।
 
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. শরীফ হোসেন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ক্লিনিক, ডায়াগোনস্ট্রিক সেন্টার ও হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।আমরা শুধু পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেই। তারপরও কোন ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
ইত্তেফাক/এমআই